বাংলাদেশে টক অব দি কান্ট্রি হেলেনা জাহাঙ্গীর


টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: বাংলাদেশে গ্রেফতারের পর দেশজুড়ে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেতা হেলেনা জাহাঙ্গীরকে নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনা শুরু হয়েছে। কেউ কেউ বলছেন কে এই হেলেনা জাহাঙ্গীর? এতদিন তাকে কেন গ্রেফতার কিংবা জবাবদিহির আওতায় আনা হয়নি। সরকারি দল আওয়ামী লীগের কোনো বড় নেতার আশকারাতে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে এতদিন রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের নিয়ে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে সম্মানহানি করার অপচেষ্টা করেছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। তার উত্থানের নেপথ্যে কারা তাকে সার্বিকভাবে সহযোগিতা করেছেন, তাদেরও আইনের আওতায় আনার দাবি সচেতন সামজ ও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমের নেটিজেনরা।

তবে এমব্রয়ডারি ব্যবসা দিয়ে উত্থান শুরু হরেও শেষ পর্যন্ত ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠনের পোস্টারকে ঘিরে পতনের সূত্রপাত ঘটে এই নেত্রীর। যদিও হেলেনা জাহাঙ্গীর আগে জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ওই দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাথে এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেলসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

আওয়ামী লীগে পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতারের পরদিন গতকাল শুক্রবার বিকেলে রাজধানীর কুর্মিটোলায় র‍্যাব সদরদফতরে আয়োজিত সংবাদ সম্মেলনে র?্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন বলেন, ব্যবসা থেকে রাজনীতিতে আসা হেলেনা জাহাঙ্গীর ‘অত্যন্ত উচ্চাভিলাষী’ ছিলেন। তিনি বলেন, মাদক আইনে ছাড়াও বন্যপ্রাণী আইন, বিশেষ ক্ষমতা আইন, ডিজিটাল নিরাপত্তা আইন এবং টেলিযোগাযোগ আইনে তার বিরুদ্ধে মামলা করা হবে। হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গুলশান থানায় হস্তান্তর করছে র‍্যাব।

এদিকে শুক্রবার ডিজিটাল নিরাপত্তা আইনের মামলায় হেলেনা জাহাঙ্গীরের ৩ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করছেন আদালত।

তিনি আরো বলেন, অস্ট্রিয়া প্রবাসী আলোচিত সেফুদার সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের লেনদেন ছিল। সেফুদাকে তাকে নাতি ডাকতেন। সেফুদার সঙ্গে তার নিয়মিত যোগাযোগ ছিল। সেফুদা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে অশ্লীল ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্যের মাধ্যমে দেশবাসীর নজর কাড়তে চেষ্টা করেন। তার সঙ্গে হেলেনা জাহাঙ্গীরের নিয়মিত যোগাযোগ ও লেনদেন রয়েছে বলে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়। তিনি বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীর অপকৌশলের মাধ্যমে নিজেকে ‘মাদার তেরেসা’, ‘পল্লীমাতা’, ‘প্রবাসীমাতা’ হিসেবে পরিচিতি পেতে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনকে ঢাল হিসেবে ব্যবহার করেন। তার পৃষ্ঠপোষকতায় একটি সংঘবদ্ধ চক্র ভুয়া খেতাবের অপপ্রচার চালাত।

কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরো বলেন, বিভিন্ন দেশি-বিদেশি সংস্থা ও ব্যক্তিবর্গ থেকে জয়যাত্রা ফাউন্ডেশনের নামে অর্থ সংগ্রহ করতেন। যা মানবিক সহায়তায় ব্যবহারের চেয়ে গ্রেফতারকৃতদের খেতাব প্রচার-প্রচারণায় বেশি ব্যবহার করা হতো। হেলেনা বিভিন্ন সামাজিক সংগঠনের সঙ্গে সম্পৃক্ততা রেখে নিজের বিভিন্ন এজেন্ডা বাস্তবায়ন করতেন।

র‌্যাবের আইন ও গণমাধ্যম শাখার পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন আরো বলেন, গ্রেফতারকৃত হেলেনা জাহাঙ্গীর উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ব্যবহার করে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিবর্গের মানহানি ও সুনাম নষ্ট করেছেন। তিনি মিথ্যা ও বানোয়াট তথ্য প্রচার করে জনমনে বিভ্রান্তির সৃষ্টি করেছেন। এছাড়া খ্যাতি লাভের আশায় বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিদের সঙ্গে ছবি তুলে তা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে দিয়ে সম্মানিত ব্যক্তিবর্গকে বিব্রত করতেন। বিভিন্ন সময়ে বিভিন্ন প্রেক্ষাপটে ফেসবুক লাইভে এসে অযাচিত ও কুরুচিপূর্ণ বক্তব্য প্রদান করতেন।

জানা গেছে, আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ-কাণ্ডে ক্ষমতাসীন দলের কেন্দ্রীয় কমিটির পদ হারানো ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীর কীভাবে কুমিল্লা আওয়ামী লীগের পদ বাগিয়েছিলেন, তা নিয়ে জেলার নেতাদের মধ্যে চলছে নানা আলোচনা। তার জন্মস্থান কুমিল্লা। স্থানীয় রাজনীতিতে সক্রিয় না থাকলেও গত ডিসেম্বরের কমিটিতে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য করা হয় তাকে। আওয়ামী লীগের নারীবিষয়ক উপকমিটি থেকে হেলেনাকে বাদ দেয়ার পর কুমিল্লা আওয়ামী লীগও জানায়, গত মাসেই তার পদ বাতিল করা হয়েছে। প্রশ্ন হলো, তিনি কীভাবে ক্ষমতাসীন দলের কুমিল্লা শাখার ওই পদে স্থান পেয়েছিলেন। গত বছর ১ ডিসেম্বর কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের পূর্ণাঙ্গ কমিটি দেয়া হয়। এই কমিটির সভাপতি মু. রুহুল আমিন বলতে পারেননি কার বদৌলতে হেলেনা স্থান পেয়েছেন তার কমিটিতে। তিনি কেবল বলেছেন, কেন্দ্রীয়ভাবে লবিং করায় তাকে কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা সদস্য করা হয়। তবে লবিংটি কে করেছিলেন, সে বিষয়ে ‘কিছু জানি না’ বলে প্রসঙ্গটি শেষ করেন তিনি। তিনি বলেন, এ পদটা মূলত তিনি লবিং করে পেয়েছেন। এ নিয়ে আমরা তেমন কিছু জানতাম না। আর বিষয়টা নিয়ে আমরা কমিটিতে যারা আছি, তাদের কোনো মাথাব্যথাও নেই। কেননা এ পদ দলীয় কার্যক্রম পরিচালনার জন্য গুরত্বপূর্ণ কিছু না। হেলেনা জাহাঙ্গীর একজন ব্যবসায়ী হিসেবে চিনতাম। তিনি আমাদের কাছে পোড় খাওয়া কোনো রাজনৈতিক ব্যক্তিও নন। কথা হয় কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রোশন আলী মাস্টারের সাথে। তিনি বলেন, তদবিরে কমিটিতে এসেছেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। তিনি রাজনৈতিক ক্যারিয়ার দিয়ে নয়, বরং আওয়ামী লীগের বড় নেতার মাধ্যমে লবিং দিয়ে এসেছিলেন। তবে রোশন আলী মাস্টারও হেলেনার পক্ষে তদবির করা সেই বড় নেতার নাম বলতে পারেননি। গত শনিবার হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দেয়ায় তুমুল আলোচনা শুরু হয়েছে কুমিল্লায়। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে রীতিমতো ঝড় উঠেছে। দলীয় নেতা-কর্মীদের অভিযোগ, হেলেনা জাহাঙ্গীর দলের নাম ভাঙিয়ে ব্যক্তিগত প্রচারে ব্যস্ত থাকতেন। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ফেসবুকে তার কর্মকা-ে বিব্রত হতেন স্থানীয় নেতা-কর্মীরা। হেলেনা জাহাঙ্গীরের জন্ম কুমিল্লার দাউদকান্দিতে। বাবা আবদুল হক শরীফ মারা গেছেন। তিনি জাহাজের ক্যাপ্টেন ছিলেন। বাবার চাকরির সুবাদে তিনি বড় হয়েছেন চট্টগ্রামে। ১৯৯০ সালের ৫ অক্টোবর কুমিল্লার বুড়িচংয়ের জাহাঙ্গীর আলমের সঙ্গে বিয়ে হয় হেলেনার। তাদের সংসারে তিন সন্তান রয়েছে। সমপ্রতি ফেসবুকে নেতা বানানোর ঘোষণা দিয়ে ছবি পোস্ট করে বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ নামের একটি সংগঠন। এতে সংগঠনের জেলা, উপজেলা আর বিদেশ শাখার সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদক হতে আগ্রহীদের যোগাযোগ করতে বলা হয়। যোগাযোগের জন্য ফোন নম্বরও দেয়া থাকে। এরপর শৃঙ্খলা ভঙ্গের অভিযোগে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে অব্যাহতি দেয়া হয়। ২৫ জুলাই দলটির মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব মেহের আফরোজ চুমকি স্বাক্ষরিত এক বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, হেলেনা জাহাঙ্গীর আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপকমিটির সদস্য ছিলেন। কিন্তু সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে প্রচারিত তার সামপ্রতিক কর্মকা- সংগঠনের নীতি বহির্ভূত হওয়ায় আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যপদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। জয়যাত্রা টেলিভিশনের প্রতিষ্ঠাতা ও সিইও হেলেনা গত ১৭ জানুয়ারি উপ-কমিটির সদস্য হয়েছিলেন। তার আগে ২০২০ সালের ডিসেম্বরের দিকে তিনি কুমিল্লা উত্তর জেলা আওয়ামী লীগের উপদেষ্টা পরিষদের সদস্য হন।

এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাতে চাকরিজীবী লীগ নামে একটি ভুঁইফোড় সংগঠন প্রতিষ্ঠার অভিযোগে আওয়ামী লীগের বহিষ্কৃত নেত্রী হেলেনা জাহাঙ্গীরের রাজধানীর গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডের ৫ নম্বর বাসায় অভিযান চালায় র‍্যাব। রাত সাড়ে আটটা থেকে শুরু হওয়া অভিযানে বিপুল সংখ্যক র?্যাব সদস্য বাড়ির ভিতর ও বাইরে অবস্থান নেয়। আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের দেখে আলোচিত এই নারী অঝরে কাঁদতে থাকেন। এসময় তাকে শান্ত করা হয়। ওই বাসায় প্রায় চার ঘণ্টা অভিযান শেষে আলোচিত ব্যবসায়ী হেলেনা জাহাঙ্গীরকে আটক করে র‍্যাব। এসময় তার বাসা থেকে ১৯ বোতল বিদেশি মদ, একটি ক্যাঙ্গারুর চামড়া, একটি হরিণের চামড়া, দুটি মোবাইল ফোন, ১৯টি চেক বই ও বিদেশি মুদ্রা, দুটি ওয়াকিটকি সেট এবং জুয়া বা ক্যাসিনো খেলার সরঞ্জামাদি ৪৫৬টি চিপস, চাকু উদ্ধার করা হয়।

তবে বাসা থেকে মদ উদ্ধারের বিষয়ে জানতে চাইলে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মেয়ে জেসিয়া বলেন, আমার ভাইয়া মদ পান করে। সেগুলোই বাসায় ছিল। তবে ভাইয়ার মদ পানের লাইসেন্স রয়েছে। পাসপোর্টও আছে। হরিণের চামড়ার বিষয়ে জানতে চাইলে জেসিয়া বলেন, ভাইয়ার বিয়ের সময় মায়ের সঙ্গে রাজনীতি করা নেতানেত্রীরা মিলে ওইটা গিফট করেছে। সেটি ওয়ালে ঝোলানো ছিল। ক্যাসিনোর সরঞ্জামাদির বিষয়ে তিনি বলেন, ক্যাসিনোর চিপস ওগুলো আমরা নিজেরাই খেলতাম আর সময় কাটাতাম। তবে ক্যাসিনো খেলতে যে বোট আর সরঞ্জাম লাগে তা নেই আমাদের। বাসায় তা খেলে না কেউ? জাস্ট ক্যাসিনোর চিপগুলো ছিল বাসায়। বিদেশি মুদ্রার বিষয়ে জানতে চাইলে জেসিয়া বলেন, আমরা নিয়মিত বিদেশে যাই। একাধিক দেশে আমাদের নিয়মিত যাতায়াত রয়েছে। বিদেশ থেকে আসার পর যে মুদ্রাগুলো বেঁচে যায় সেগুলো তো রাস্তায় ফেলে দিতে পারি না। ওইসব মুদ্রা থেকে গেছে।

অভিযান শেষে র‍্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট পলাশ কুমার বসু বলেন, তিনটি ফ্লোর মিলে তিনি এই ভবনটিতে বসবাস করতেন। যেখানে ১৭টি রুম রয়েছে। এসব রুমেই মিলেছে অবৈধ মাদকসহ বিভিন্ন সরঞ্জাম। জব্দকৃত আলামত ও সুনির্দিষ্ট অভিযোগের ভিত্তিতে তাকে আটক করে র‍্যাব সদর দফতরে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়।

যেভাবে উত্থান হেলেনা জাহাঙ্গীরের : কখনো ব্যবসায়িক আবার কখনো রাজনীতিবিদ হিসেবে আলোচনায় আসেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। ‘জয়যাত্রা’ নামে অনুমোদনহীন একটি আইপি টেলিভিশনের মালিক বনে যান রাতারাতি। নিজের অপরাধের ঢাল হিসেবে ব্যাবহার করেন এটিকে। তার আসল নাম হেলেনা আক্তার। ১৯৯০ সালে জাহাঙ্গীর আলম নামে এক ব্যবসায়ীকে বিয়ে করে নামের সাথে যুক্ত হয় জাহাঙ্গীর। তিন সন্তানের জননী তিনি। ১৯৭৪ সালের ২৯ আগস্ট ঢাকার তেজগাঁওয়ে জন্মগ্রহণ করেন তিনি। বাবা মরহুম আবদুল হক শরীফ ছিলেন জাহাজের ক্যাপ্টেন। বাবার চাকরির সুবাধে হেলেনা জাহাঙ্গীরের বেড়ে ওঠা চট্টগ্রামের হালিশহরের মাদারবাড়ী, সদরঘাট এলাকায়। পড়াশোনা স্থানীয় কৃষ্ণচূড়া স্কুলে। চাকরি সূত্রে তার বাবা প্রমোশনাল প্রস্তাব পেয়ে রাশিয়ায় চলে গেলে মায়ের সাথে গ্রামের বাড়ি ফিরে যান হেলেনা। ৮ম শ্রেণীতে পড়া অবস্থায় জাহাঙ্গীর আলমের সাথে বিবাহবন্ধনে আবদ্ধন হন হেলেনা। স্বামীর সংসারে হেলেনা জাহাঙ্গীর পড়াশোনা অব্যাহত রাখেন; শেষ করেন স্নাতকোত্তর। এরপর শুরু করেন তার উদ্যোক্তা জীবন। অসহায় মানুষের পাশে দাঁড়িয়ে সমাজ সেবক ‘সিস্টার’ হেলেনা জাহাঙ্গীর নামে পরিচিতি পান তিনি। সমাজসেবক ও নারী উদ্যোক্তা হিসেবে বিভিন্ন সময় মিডিয়ায় টকশোতে অংশগ্রহণ করেন। এছাড়াও প্রায় এক ডজন সামাজিক সংগঠনের নেতৃস্থানীয় দায়িত্বে রয়েছেন হেলেনা। রাজনৈতিক অঙ্গনে রয়েছে তার দাপুটে উত্থান ও পদচারণ। সফল নারী উদ্যোক্তা ও ব্যবসায়ী হিসেবে মিডিয়ায় হেলেনা জাহাঙ্গীর আলোচনায় আসেন। এরপর তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। নিজেও একটি জয়যাত্রা আইপি টিভি চালু করেন। জয়যাত্রা গ্রুপের কর্ণধার হেলেনা জাহাঙ্গীর নিজেকে আইপি টিভি ও নার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন। হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি। শুধু তাই নয়, প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরষ্কৃতও হয়েছেন রোটারি ক্লাবের একজন ডোনার হিসেবে। প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছেন তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে। প্রধানমন্ত্রীর সাথে কয়েকটি বিদেশযাত্রার সফরসঙ্গীও হয়েছিলেন তিনি। প্রশ্ন উঠেছে এইসব সফরে কারা তাকে যুক্ত করেছেন, তাদের বিচার আদৌ হবে কি?

এমব্রয়ডারিতে উত্থান, চাকরিজীবী লীগে পতন : বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর। ‘আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামে একটি সংগঠনের পোস্টারকে ঘিরে পতনের সূত্রপাত ঘটে এই নেত্রীর। তবে হেলেনা জাহাঙ্গীর আগে জাতীয় পার্টি, বিএনপি এবং সর্বশেষ আওয়ামী লীগের রাজনীতিতে নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেছিলেন। ওই দুটি দলের প্রধান খালেদা জিয়া এবং হুসেইন মুহম্মদ এরশাদের সাথে এবং আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ওবায়দুল কাদের ও মুক্তিযুদ্ধবিষয়ক মন্ত্রী আ ক ম মোজাম্মেলসহ বেশ কিছু প্রভাবশালী ব্যক্তিদের সাথে তার ছবিও গণমাধ্যমে প্রকাশ পেয়েছে। প্রয়াত মেয়র আনিসুল হকের প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে ২০১৫ সালে ঢাকা উত্তর সিটি কর্পোরেশনের মেয়র নির্বাচন করার উদ্যোগ নিয়েছিলেন তিনি।

অপর একটি সূত্র জানায়, বেশ কয়েক বছর ধরে আলোচনার কেন্দ্রবিন্দুতে রাজনীতিবিদ, ব্যবসায়ী ও নারী উদ্যোক্তা হেলেনা জাহাঙ্গীর। সমপ্রতি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ‘বাংলাদেশ আওয়ামী চাকরিজীবী লীগ’ নামের একটি সংগঠনের পোস্টার ভাইরাল হলে আলোচনায় উঠে আসেন হেলেনা জাহাঙ্গীর। পোস্টারে সংগঠনের কেন্দ্রীয় সভাপতি হেলেনা জাহাঙ্গীর আর সাধারণ সম্পাদক মাহবুব মনিরের নাম উল্লেখ্য করা হয়। এরপরই আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ হারান হেলেনা জাহাঙ্গীর। ২৫ জুলাই দলটির মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য সচিব মেহের আফরোজ চুমকি স্বাক্ষরিত সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে এ তথ্য জানানো হয়। এর আগে ২৪ জুলাই মেহের আফরোজ চুমকি বলেন, বারবার শৃঙ্খলা ভঙ্গ করায় হেলেনা জাহাঙ্গীরের সদস্য পদ আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে বাতিলের সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। তবে ‘চাকরিজীবী লীগ’ নামের সংগঠনে সদস্যপদ দেয়ার কথা বলে বেশ কয়েকজনের কাছে হেলেনা টাকা দাবি করেন। আর এ কারণেই আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্য পদ থেকে তাকে অব্যাহতি দেয়া হয় বলে জানা গেছে। হেলেনা জাহাঙ্গীর ব্যবসায়ী ও শিল্পপতিদের শীর্ষ সংগঠন ফেডারেশন অব বাংলাদেশ চেম্বার্স অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রিজের (এফবিসিসিআই) সদস্য ও নির্বাচিত পরিচালক। পোশাক শিল্প মালিকদের দুই সংগঠন বিজিএমইএ ও বিকেএমইএরও সক্রিয় সদস্য তিনি। এছাড়াও তিনি আইপি টিভি ওনার্স অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের সভাপতি হিসেবেও পরিচয় দেন।

জয়যাত্রা নামে একটি আইপি টেলিভিশনেরও মালিক তিনি। প্রধানমন্ত্রী কর্তৃক পুরস্কৃতও হয়েছেন রোটারি ক্লাবের একজন ডোনার হিসেবে। প্রিন্টিং, অ্যামব্রয়ডারি, প্যাকেজিং, স্টিকার এবং ওভেন গার্মেন্টস প্রতিষ্ঠানের কর্ণধার হিসেবেও তার পরিচিতি রয়েছে। জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় এসব শিল্প প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। সব মিলিয়ে ১২ হাজার কর্মী কাজ করছেন তার বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানে।

এদিকে আওয়ামী লীগের মহিলা বিষয়ক উপ-কমিটি থেকে সদ্য বহিষ্কৃত হেলেনা জাহাঙ্গীরের বাসায় অভিযান চালিয়ে গ্রেফতার করে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে। র‍্যাবের অভিযোগ, ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগে হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার দেখিয়ে তার বিরুদ্ধে মামলা করেছে হয়েছে। একইসাথে মাদক, বিদেশি মুদ্রা ও বন্যপ্রাণীর চামড়া জব্দের ঘটনায় আলাদা আলাদা মামলা করা হয়েছে। শুক্রবার দুপুরে র‍্যাব সদর দফতর থেকে এতথ্য জানানো হয়। এর আগে গত বৃহস্পতিবার রাত ৮টার পর হেলেনা জাহাঙ্গীরের গুলশান-২ এর ৩৬ নম্বর রোডের বাসভবনে অভিযান শুরু করে র‍্যাব। দীর্ঘ চার ঘণ্টা অভিযান শেষে রাত সোয়া ১২টার দিকে তাকে আটক করা হয় এবং পরে র‍্যাব সদরদপ্তরে নিয়ে যাওয়া হয়।

হেলেনার জয়যাত্রা টিভির সরঞ্জাম জব্দ : আওয়ামী লীগের মহিলাবিষয়ক উপ-কমিটির সদস্যপদ থেকে সমপ্রতি অব্যাহতি পাওয়া আলোচিত হেলেনা জাহাঙ্গীরকে গ্রেফতার দেখিয়েছে র‌্যাব। তার বিরুদ্ধে ডিজিটাল প্লাটফর্ম ব্যবহার করে মিথ্যাচার, অপপ্রচার ও বিভ্রান্তিকর তথ্য ছড়িয়ে রাষ্ট্রীয় গুরুত্বপূর্ণ সংস্থা ও ব্যক্তিদের সম্মানহানি করার অপচেষ্টার অভিযোগ আনা হয়েছে। এসব অভিযোগে ডিজিটাল সিকিউরিটি আইনে একটি, মাদকদ্রব্য নিয়ন্ত্রণ আইনে একটি এবং বন্য প্রাণী সংরক্ষণ আইনে আরেকটি মামলা করার প্রস্তুতি চলছে বলে জানা গেছে। এদিকে হেলেনা জাহাঙ্গীরের মালিকানাধীন আইপিটিভি জয়যাত্রার অফিস থেকে বিপুল পরিমাণ সরঞ্জাম জব্দ করা হয়েছে। এসব সরঞ্জামের কোনোটিরই বিটিআরসির অনুমোদন ছিল না বলে জানিয়েছে র‍্যাব। শুক্রবার দুপুরে র‍্যাব সদরদফতরে সাংবাদিকদের এক প্রশ্নের জবাবে এ কথা বলেন র‍্যাবের লিগ্যাল অ্যান্ড মিডিয়া উইংয়ের পরিচালক কমান্ডার খন্দকার আল মঈন। তিনি বলেন, জয়যাত্রা টেলিভিশনের কোনো ধরনের বৈধ কাগজপত্র নেই। জয়যাত্রার মিরপুরের অফিসে অনেক সরঞ্জামাদি পাওয়া গেছে যেগুলো স্যাটেলাইট টিভির ক্ষেত্রে ব্যবহার করা হয়। বিটিআরসির সহযোগিতায় এসব মালামাল জব্দ করা হচ্ছে। সেখানে টেলিযোগাযোগ আইনে কী মামলা করা যায় সেটাও প্রক্রিয়াধীন রয়েছে। তিনি বলেন, হেলেনা জাহাঙ্গীরকে প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে আমরা জানতে পারি, তিনি বিভিন্ন ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে সম্মানীয় ব্যক্তিদের সম্মানহানি করে আসছিলেন। রাষ্ট্রীয় কয়েকটি সংস্থার বিরুদ্ধে তিনি অপপ্রচার চালিয়ে আসছিলেন। তার বিষয়ে কী কী মামলা করা যায় সেটা পর্যালোচনা করে দেখছি। মামলার পরে তাকে পুলিশের কাছে সোপর্দ করা হবে।

বিয়ের ছয় বছর পর ১৯৯৬ সালে রাজধানীর মিরপুর ১১-তে একটি ভবনের দুটি ফ্লোর নিয়ে হেলেনা শুরু করেন প্রিন্টিং ও এমব্রয়ডারি ব্যবসা। নিট কনসার্ন প্রিন্টিং ইউনিট লিমিটেড দিয়ে শুরু করে জয়যাত্রা গ্রুপের আওতায় একে একে তিনি গড়ে তোলেন জয় অটো গার্মেন্টস লিমিটেড, জেসি এমব্রয়ডারি অ্যান্ড প্রিন্টিং এবং হুমায়রা স্টিকার লিমিটেড। সবকটি প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থাপনা পরিচালক তিনি। হেলেনা জাহাঙ্গীর গুলশান ক্লাব, গুলশান নর্থ ক্লাব, বারিধারা ক্লাব, কুমিল্লা ক্লাব, গলফ ক্লাব, গুলশান অল কমিউনিটি ক্লাব, বিজিএমইএ অ্যাপারেল ক্লাব, বোট ক্লাব, গুলশান লেডিস ক্লাব, উত্তরা লেডিস ক্লাব, গুলশান ক্যাপিটাল ক্লাব, গুলশান সোসাইটি, বনানী সোসাইটি, গুলশান জগার্স সোসাইটি ও গুলশান হেলথ ক্লাবের সঙ্গে যুক্ত।

print

Leave a Reply

সর্বশেষ