চীন-রাশিয়ার যৌথ সামরিক মহড়া কেন?

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, আন্তর্জাতিক ডেস্ক: পশ্চিমা বিশ্ব যখন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের আইনি-রাজনৈতিক সংকট, ব্রেক্সিট ও অভ্যন্তরীণ নানা বিষয় নিয়ে ব্যস্ত, চীন তখন তিন দশকের মধ্যে রাশিয়ার সবচেয়ে বড় সামরিক মহড়ায় যোগ দিতে যাচ্ছে। সোভিয়েত ইউনিয়নের পতনের পর রাশিয়ার সবচেয়ে বড় এ সামরিক মহড়াটির নাম দেওয়া হয়েছে ‘ভস্টক-২০১৮’ (পূর্ব-২০১৮)। সেপ্টেম্বরে অনুষ্ঠেয় এ মহড়ায় দেশটির তিন লাখ সেনা, ৯০০ ট্যাংক, এক হাজার জঙ্গি বিমান ও নৌবাহিনীর দুটি যুদ্ধজাহাজ অংশ নেবে। চীন তাদের ইতিহাসের সবচেয়ে বড় নৌ মহড়ার মাত্র ছয় মাসের মাথায় বড় ধরনের আরেকটি সামরিক মহড়ায় যোগ দিতে যাচ্ছে। এ সামরিক মহড়াটি বিশেষ কারণে সবার মনোযোগের কেন্দ্রে থাকবে, কারণ এতে অংশ নিচ্ছে বর্তমান বিশ্বের অন্যতম দুই সামরিক পরাশক্তি রাশিয়া ও চীন।
দুটি দেশই সাম্প্রতিক বছরগুলোতে যুক্তরাষ্ট্রের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। যখন অন্য দেশগুলো যুক্তরাষ্ট্র ও তার মিত্র দেশগুলোর সঙ্গে সম্ভাব্য যুদ্ধ এড়িয়ে চলছে, তখন এ দেশগুলো তাদের অব্যাহত তৎপরতার মাধ্যমে যুক্তরাষ্ট্রকে বুঝিয়ে দিতে চাইছে যে, তারা যুদ্ধের জন্য অতীতের যেকোনো সময়ের চেয়ে এখন আরও বেশি প্রস্তুত। তারা পেন্টাগনকে বোঝাতে চাইছে, পূর্ব ইউরোপ কিংবা দক্ষিণ চীন সাগরে সংঘটিত কোনো যুদ্ধে যুক্তরাষ্ট্র হস্তক্ষেপ করলে ভয়াবহ ক্ষতির মুখোমুখি হতে হবে। একই সঙ্গে এত সামরিক শক্তি প্রদর্শনের অরেকটি উদ্দেশ্য হচ্ছে, পার্শ্ববর্তী দেশগুলোকে ভয় ও চাপের মধ্যে রাখা।সামরিক খাতে চীন এবং রাশিয়ার বিনিয়োগ ও উন্নতির আরেকটি নিদর্শন হয়ে থাকবে এ সামরিক মহড়া। যদিও এ ধরনের মহড়ার কিছু অসুবিধার দিকও আছে।
রয়টার্স জানিয়েছে, গত বছর উত্তর মেরুর কোনো এক জায়গায় মহড়ার সময় রাশিয়ার একটি পরমাণবিক ক্ষেপণাস্ত্র নিক্ষেপের চেষ্টা ব্যর্থ হয়। দেশটি এখনো সেই ক্ষেপণাস্ত্রটি উদ্ধার করতে পারেনি। গত দুই বছর ধরে দক্ষিণ চীন সাগরে সামরিক মহড়ায় চীনা জঙ্গি বিমান বিধ্বস্তের পরিমাণ উদ্বেগজনকভাবে বেড়েছে।
সামরিক ও অর্থনৈতিক সম্ভাব্য ঝুঁকির কথা মাথায় রেখেও দেশ দুটি এমন সামরিক মহড়ার উদ্যোগ নিয়েছে। এতেই বোঝা যায়, তারা যুক্তরাষ্ট্র এবং এশিয়া-ইউরোপে মার্কিন মিত্র দেশগুলোর তুলনায় সামরিক ক্ষমতা প্রদর্শনের জন্য বেশি ঝুঁকি নিতে প্রস্তুত।
সেপ্টেম্বরের এ মহড়ায় রাশিয়া বেশ কয়েক বছরের মধ্যে ভূমধ্যসাগরে তাদের সবচেয়ে বড় নৌ-বহর প্রদর্শন করবে। এটি যুক্তরাষ্ট্রের প্রতি রাশিয়ার আরেকটি নগ্ন সতর্কবার্তা যে, যুক্তরাষ্ট্র যদি সিরিয়ায় রাশিয়ার কর্মকাণ্ডে ফের হস্তক্ষেপ করার চেষ্টা করে, তাহলে তারা সমুচিত জবাব দিতে প্রস্তুত আছে। কিন্তু যুদ্ধ যদি সত্যিই বাঁধে, তাহলে দেশ দুটির ভূমিকা হবে ভিন্ন।

শুধু যে শক্তি প্রদর্শনই এ সামরিক মহড়ার উদ্দেশ্য সেটি নয়, এর পেছনে পুতিনের রাজনৈতিক স্বার্থও আছে। রাশিয়ায় পুতিনের জনপ্রিয়তা কমতির দিকে। এমন জাঁকজমকপূর্ণ সামরিক মহড়া দেশের ভেতরে তার জনপ্রিয়তা বাড়াতে কাজে আসবে। চীনা প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংও সামরিক জাতীয়তাবাদকেই আলিঙ্গন করেছেন।

রাশিয়া মনে করছে, তাদের নিটকবর্তী সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে স্থলভাগে। ২০০৮ ও ২০১৪ সালে তারা তাদের সীমান্তের কয়েক মাইলের মধ্যে থাকা জর্জিয়া ও ইউক্রেনে সামরিক হস্তক্ষেপ করে সফল হয়েছে। এ দুটি ক্ষেত্রেই যুক্তরাষ্ট্রসহ অন্য পশ্চিমা শক্তিশালী দেশগুলো রাশিয়ার বিরুদ্ধে সামরিক হস্তক্ষেপ থেকে বিরত থেকেছে।

চীন মনে করছে, তাদের নিকটবর্তী সম্ভাব্য যুদ্ধ হতে পারে দক্ষিণ চীন সাগরে। এ সাগরের নিয়ন্ত্রণ নিয়ে চীনের সঙ্গে যুক্তরাষ্ট্রের বিবাদ দীর্ঘদিনের। চীন এ সাগরের প্রায় পুরো অংশের মালিকানা দাবি করে। কিন্তু উপকূলীয় অন্য দেশগুলোও এ সাগরে তাদের মালিকানা দাবি করে আসছে। বিশেষ করে যুক্তরাষ্ট্র চীনের এ দাবির বিরুদ্ধে সবচেয়ে বড় হুমকি।

যুক্তরাষ্ট্রের দাবি, আন্তর্জাতিক আইন অনুযায়ী, দক্ষিণ চীন সাগরের এক বড় অংশ আন্তর্জাতিক জলসীমার অংশ এবং সেখানে যে কারও প্রবেশাধিকার আছে। কিন্তু সাগরের মধ্যে কৃত্রিম সামরিক দ্বীপ গড়ে এ দাবিকে মাটিচাপা দিতে চাইছে চীন। দেশটি তাইওয়ানকে ঘিরে আরেকটি সম্ভাব্য যুদ্ধের মুখে আছে।

তাইওয়ানকে চীন বরাবরই নিজেদের একটি অঙ্গরাজ্য হিসেবে দাবি করে আসছে। কিন্তু তাইওয়ান নিজেদের স্বাধীন রাষ্ট্র মনে করে। চীন হুমকি দিয়ে আসছে এই বলে যে, তাইওয়ান যদি স্বেচ্ছায় চীনের সঙ্গে একীভূত না হয়, তাহলে প্রয়োজনে বলপ্রয়োগ করা হবে।

চীন ও রাশিয়ার সমরাস্ত্রগুলো, বিশেষ করে চীনের ক্ষেপণাস্ত্র ও সাবমেরিনগুলোতে এমন অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহার করা হয়েছে, যাতে সেগুলো যুক্তরাষ্ট্রের বিমানবাহী রণতরীগুলো ডোবাতে সক্ষম। অর্থাৎ, বিশ্বের অন্যতম শীর্ষ দুটি সামরিক শক্তিশালী দেশ নির্দিষ্টভাবে যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে ব্যবহার করার জন্য বিশেষ সমরাস্ত্র গড়ে ‍তুলেছে, যেটি নিশ্চয়ই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য অনেক বড় মাথাব্যথার কারণ।

এসবের বাইরে কৌশলগত কারণেও সামরিক অস্ত্র কেনাবেচা করছে দেশ দুটি। জর্জিয়া ও ইউক্রেনের ন্যাটো জোটে যোগ দেওয়ার বিরুদ্ধে রাশিয়া খুবই আগ্রাসীভাবে তদবির করেছিল। রাশিয়ার সামাজিকমাধ্যম ও টেলিভিশনের ফিড খুব সূক্ষ্নভাবে পর্যবেক্ষণ করলে বোঝা যাবে, দেশটি বাল্টিক দেশগুলোতে তাদের সমর্থন কমিয়ে দিয়েছে। বাল্টিক কয়েকটি দেশ ন্যাটো জোটভুক্ত।

তাইওয়ানকে বিচ্ছিন্ন করতে চীন এ বছর থেকে আরও আগ্রাসী ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছে। তারা আন্তর্জাতিক বিমান সংস্থাগুলো ও বিদেশি সরকারগুলোকে তাইওয়ানকে স্বতন্ত্র দেশ হিসেবে স্বীকৃতি না দিতে চাপ দিয়েছে। অনেক বিশ্লেষক মনে করছেন, তাইওয়ান ইস্যুতে চীন সামনের মাসগুলোতে আরও আগ্রাসী আচরণ করবে।

যুক্তরাষ্ট্রও যে একদম হাত গুটিয়ে বসে আছে, তা নয়। ইউরোপে, বিশেষ করে নরওয়ে ও পোল্যান্ডের মতো রাশিয়ার সরাসরি হুমকির মুখে থাকা দেশগুলোতে ন্যাটোর সামরিক মহড়া বেড়েছে। চীনের হুমকি উপেক্ষা করেই যুক্তরাষ্ট্র ও মিত্র দেশগুলোর যুদ্ধজাহাজ ও যুদ্ধবিমান বিতর্কিত দক্ষিণ চীন সাগরে উপস্থিতি বাড়িয়ে চলেছে।

স্পষ্টত রাশিয়া ও চীন-উভয়েরই যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে সামরিক ক্ষোভ আছে। চীন চাচ্ছে আসিয়ান দেশগুলোকে নিয়ে আলাদা সামরিক মহড়া করতে, যেখানে যুক্তরাষ্ট্রের উপস্থিতি থাকবে না। আবার রাশিয়া বলছে, বাল্টিক দেশগুলোতে ন্যাটোর সামরিক মহড়া রুশ সীমান্ত অঞ্চল ও সেনাবাহিনীর প্রতি হুমকিস্বরুপ। অর্থাৎ, বিশ্বজুড়ে পরাশক্তিগুলোর বিবাদ ক্রমশ আরও বেশি দৃশ্যমান হচ্ছে।

যুক্তরাষ্ট্র এ বছর তাদের বার্ষিক রিমপ্যাক প্রশান্ত মহাসাগরীয় নৌ মহড়ায় চীনের আমন্ত্রণ প্রত্যাহার করেছে। দক্ষিণ চীন সাগরে চীনের ‘অন্যায়’ উপস্থিতির প্রতিবাদস্বরূপ এ সিদ্ধান্ত নিয়েছে বলে জানিয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।

চীন ও রাশিয়ার জন্য যুক্তরাষ্ট্র হচ্ছে সাধারণ প্রতিপক্ষ। যুক্তরাষ্ট্রকে নিজেদের ক্ষমতা দেখিয়ে দিতে যৌথ সামরিক মহড়ার আয়োজন করলেও দেশ দুটির মধ্যে পারস্পরিক বিশ্বস্ত সম্পর্ক আছে, এমনটা মনে করার কোনো কারণ নেই। চীনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ নিয়ে রাশিয়া অনেকদিন ধরেই ভয়ে আছে যে, চীন তাদের কোনো অঞ্চল দখল করতে পারে। আবার রাশিয়া তাদের সামরিক শক্তি কীভাবে তাদের বিপক্ষে ব্যবহার করে, এ নিয়ে উদ্বিগ্ন চীনও।

এত জটিল সামরিক-অর্থনৈতিক-রাজনৈতিক দ্বিধা ও ক্ষমতা প্রদর্শনের খেলায় কোনটি সত্য, কোনটি মিথ্যা তা যথার্থভাবে বলা মুশকিল। কিন্তু বিশ্বের সবচেয়ে শক্তিশালী দেশগুলোর মধ্যে সামরিক সংঘাত শুরু হলে তা যে নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে এবং এর ফলে অর্থনীতি ও বিশ্বজুড়ে সাধারণ মানুষের জীবনে সীমাহীন বিপর্যয় নেমে আসবে, সেটি নিশ্চিত করেই বলা যায়।

সূত্র; প্রিয় ডটকম ও রয়টার্স।

print

Leave a Reply