সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে ‘সামর্থ্যের’ জানান দিতে চায় বিএনপি

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: হাজার হাজার মামলার কারণে হয়রানি ও গ্রেফতার এড়াতে বিএনপির নেতাকর্মীদের অনেকেই দৌঁড়ের ওপর রয়েছেন। আবার আদালতে হাজিরা দিতে দিতে অনেকের বেশির ভাগ সময়ই চলে যাচ্ছে। এর মধ্যেই দড়জায় কড়া নাড়ছে একাদশ সংসদ নির্বাচন। দশম জাতীয় সংসদ নির্বাচনে বিএনপির দাবি ছিল নির্দলীয় ব্যক্তিদের দিয়ে নির্বাচনকালীন সরকার গঠন করতে হবে। একাদশ সংসদ নির্বাচনেও তারা সেই দাবি থেকে সরে আসেনি, বরং যুক্ত হয়েছে আরও নতুন দাবি-দাওয়া।
বর্তমানে দলটির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া কারাগারে। দলের ভারপ্রাপ্ত চেয়ারম্যান তারেক রহমান রাজনৈতিকভাবে নির্বাসিত হয়ে এখন স্বপরিবারে লন্ডনে অবস্থান করছেন। প্রায় ১২ বছর ক্ষমতার বাইরে থাকা দলটি দীর্ঘ এক বছর পর রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি পেয়েছে। সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সর্বশেষ জনসভায় প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দিয়েছিলেন খালেদা জিয়া। এবার খালেদা জিয়ার অনুপস্থিতিতে ৩০ সেপ্টেম্বরের জনসভায় নিজেদের সামর্থ্যের জানান দিতে লাখো জনতা উপস্থিত করতে চায় বিএনপি।
এ প্রসঙ্গে বিএনপির স্থায়ী কমিটির সদস্য গয়েশ্বর চন্দ্র রায় বলেন, ‘বিএনপি শান্তিপূর্ণ ও নিয়মতান্ত্রিক উপায়ে গণতান্ত্রিক অধিকার প্রতিষ্ঠায় রাজপথে আন্দোলন, সংগ্রাম করে যাচ্ছে। অধিকার প্রতিষ্ঠা না হওয়া পর্যন্ত সেই আন্দোলন-সংগ্রাম অব্যাহত রাখা হবে। পিছপা হওয়ার কোনো সুযোগ নেই। আর শত নির্যাতন-নিপীড়ন, হামলা-মামলা, গ্রেফতার উপেক্ষা করে বিএনপির জনসভা মানেই হচ্ছে লাখো জনতার উপস্থিতি। এর জন্য বিএনপিকে আলাদা করে প্রস্তুতি নেওয়ার প্রয়োজন পড়ে না। বরং আওয়ামী লীগ একদিকে বিএনপিকে নির্বাচনে অংশ নিতে বলছে, অন্যদিকে বলছে- এদের (বিএনপি) হাতে ক্ষমতা দেওয়া যাবে না। এখন প্রশ্ন দেখা দিয়েছে, আওয়ামী লীগ আসলে কী চায়? নাকি তারা জোর করেই ক্ষমতায় থেকে যেতে চায়। এ ছাড়া তো উপায়ও নেই তাদের। কারণ দলটি বাঘের পিঠে চড়ে বসেছে। এ জন্যই তারা এক দলীয়, ভোটার-শূন্য নির্বাচন করতে চায়। কিন্তু জনতার আন্দোলনে মুখে এতেও তাদের শেষ রক্ষা হবে না। রাজনৈতিক ইতিহাসও তেমনটি বলে।’

২৯ সেপ্টেম্বর, শনিবার দুপুরে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভাস্থল পরিদর্শনে গিয়ে গয়েশ্বর সাংবাদিকদের বলেন, ‘সরকারের পক্ষ থেকে গত কয়েকদিন ধরে অনেক কথা বলা হচ্ছে। তারা বলছেন, রাজপথে বিএনপিকে মোকাবিলা করবে। বিএনপি জনসভা, সমাবেশের নামে সহিংসতা করবে। এই যে আগাম কথা বলা হয়েছে, সরকারের পক্ষ থেকে এখানেই আমাদের সংশয়। বিএনপির মিটিংয়ে বিএনপি কেন অস্থিরতা তৈরি করবে?’

এদিন দুপুরে এক জরুরি সংবাদ সম্মেলনে বিএনপির সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী বলেন, ‘আমাদের আগামীকালের (রবিবার) জনসভা হবে ঐতিহাসিক। দলের শীর্ষ নেতারা আগামী দিনের কর্মসূচির বিষয়ে দিকনির্দেশনা দেবেন। নির্বাচনকালে নির্দলীয় সরকারের দাবিতে আন্দোলনে জাতীয় ঐক্য প্রক্রিয়ার সঙ্গে বিএনপির সম্পর্ক কী হবে, তার দিকনির্দেশনা দেওয়া হবে এ জনসভায়।’

ইতোমধ্যে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভাকে সফল করতে বিএনপির যৌথসভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। এতে অংশ নেন- ঢাকা জেলা, গাজীপুর, টাঙ্গাইল, মুন্সীগঞ্জ, ঢাকা মহানগর বিএনপিসহ দলটির অঙ্গ সংগঠনের সভাপতি ও সাধারণ সম্পাদকরা। যৌথসভায় ঢাকার আশপাশের জেলার সংশ্লিষ্ট নেতাদের বিশেষ করে ঢাকা মহানগর বিএনপির নেতৃত্বকে সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভায় জনসমাগম ঘটানোসহ নানা দিকনির্দেশনাও দেওয়া হয়েছে।

এর আগে শনিবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে ২২টি শর্তে রাজধানীর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপিকে জনসভার অনুমতি দেয় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি)।

গত ২৪ সেপ্টেম্বর, সোমবার বিএনপির জ্যেষ্ঠ যুগ্ম মহাসচিব রুহুল কবির রিজভী সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভার ঘোষণা দিয়েছিলেন। পরদিন মঙ্গলবার সংবাদ সম্মেলন করে রিজভী জানান, বৃহস্পতিবারের পরিবর্তে শনিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বিএনপির জনসভা অনুষ্ঠিত হবে। পরে আবারও জনসভার তারিখ পরিবর্তন করে বিএনপি। শনিবার দলটির জনসভা করার কথা থাকলেও সেটি রবিবার করতে চেয়ে লিখিত আবেদন জানানো হয়। কারণ ২৯ সেপ্টেম্বর আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোটের নাগরিক সমাবেশ থাকায় ঢাকা মহানগর পুলিশ (ডিএমপি) বিএনপিকে ৩০ সেপ্টেম্বর জনসভা করার জন্য আবেদন করতে বলে।

সর্বশেষ ২০ দলীয় জোটের বৈঠক সূত্রে জানা যায়, সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভাকে ঘিরে জোট শরিক নেতাদেরকে বিএনপির পক্ষ থেকে বলা হয়, ৩০ সেপ্টেম্বর বিএনপি এককভাবে জনসভা করতে চাচ্ছে। সরকার প্রায়ই বলছে- বিএনপির জনসমর্থন নেই, আন্দোলন করার সাংগঠনিক শক্তি নাই। তাই এর জবাব দিতে লাখো জনতার একটি গণজোয়ার সৃষ্টি করতে চায় বিএনপি। জোট নেতাদের চিন্তা করার কিছু নেই। কারণ জোটের পক্ষ থেকে খুব শিগগিরই একটি সমাবেশের আয়োজন করা হবে।

অবশ্য নির্বাচন যতই ঘনিয়ে আসছে, উত্তপ্ত হচ্ছে মাঠের রাজনীতি। একই সঙ্গে নির্বাচন প্রক্রিয়া নিয়ে সমঝোতায় না আসা পর্যন্ত প্রতিনিয়ত অনিরাপদ হয়ে উঠছে জনজীবন। আশঙ্কা দেখা দিচ্ছে, জাতীয় নির্বাচনকে কেন্দ্র করে যে রাজনৈতিক সংকট তৈরি হচ্ছে, তা নিরসনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপি সমঝোতায় না আসলে পরিস্থিতি কী হবে!

এ ছাড়া নির্বাচন প্রক্রিয়া যদি সহিংসতায় রূপ নেয় তাহলে কি জরুরি অবস্থা জারি হবে, নাকি প্রধানমন্ত্রীর পদত্যাগ চলমান রাজনৈতিক সংকট থেকে উত্তরণ ও সমঝোতার পথকে সহজ করবে; এ নিয়ে হচ্ছে চুলচেরা বিশ্লেষণ।

বিএনপির নেতারা বলছেন, সরকারের কাছ থেকে অতিরিক্ত সুবিধা আদায় করে নেওয়া আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর (পুলিশ) সদস্যরাই এখন সবচেয়ে বেশি হতাশা ও দুশ্চিন্তায় ভুগছে। আর বিএনপিকে সেই সুযোগটা কাজে লাগেতে হবে, এমনকি শিগগিরই রাজপথ দখলে নিতে না পারলে দাবি আদায় করা যাবে না। পুরো দলই অস্তিত্ব সংকটে পড়বে। সর্বশক্তি দিয়ে মাঠ দখলে মরণ কামড় দেওয়া ছাড়া তাদের সামনে আর কোনো পথ খোলা নেই। রাজপথ দখলে নিতে না পারলে তাদের রাজনীতির ভবিষ্যৎ অন্ধকার। তাই বিএনপির এখন একটাই লক্ষ্য, যে কোনো মূল্যে ক্ষমতা থেকে আওয়ামী লীগকে সরাতে হবে।

আর রক্ষণাত্মক মনোভাব সরকারের। আওয়ামী লীগ নেতাদের উপলব্ধি, রাজপথে আন্দোলনের শুরুতেই বিএনপিকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে না পারলে বা ক্ষমতা হাতছাড়া হলে তাদেরকে সংকটে ফেলবে বিএনপি-জামায়াত। তাই আন্দোলনের নামে বিরোধীদলের যে কোনো নৈরাজ্য, সংঘাত-সংঘর্ষ মোকাবিলায় দলীয় নেতাকর্মীদের মাধ্যমে শক্ত প্রতিরোধ গড়ে তোলার চূড়ান্ত পরিকল্পনা হাতে নেওয়া হয়েছে। রাজধানীর প্রতিটি থানা ও ওয়ার্ডে আওয়ামী লীগ ও দলের অঙ্গ সংগঠনকেও সার্বিকভাবে প্রস্তুত থাকতে বলা হয়েছে।

গত ২৬ সেপ্টেম্বর বিএনপির মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর বলেন, ‘সোহরাওয়ার্দীর জনসভায় আমরা দলের নীতি নির্ধারণী বক্তব্য দেব। ভবিষ্যৎ কর্মপন্থা ও কর্মসূচি তুলে ধরব।’

২০০৬ সালের ২৮ অক্টোবর দেশের প্রধান দুই দলকে প্রথম মুখোমুখি সংঘাতে জড়িয়ে পড়তে দেখা যায়। তবে ওই সংঘাত ছিল মূলত ক্ষমতায় যাওয়ার লড়াই। কিন্তু এবার দেশে যে সংঘাতপূর্ণ রাজনৈতিক পরিস্থিতি সৃষ্টি হতে যাচ্ছে, তাতে (আওয়ামী লীগ-বিএনপি) দুই দলের জন্যই নিজেদের অস্তিত্ব রক্ষার প্রশ্ন সামনে দাঁড়িয়েছে। যেখানে উভয় দলের নেতারা মনে করছে, এই লড়াইয়ে জয়ী হতে না পারলে তাদের অস্তিস্ব কঠিন সংকটের মধ্যে পড়বে। এতে এই মুহূর্তে কেউই ছাড় দিতে রাজি নয়।

ইতোমধ্যে বিএনপিকে মোকাবেলা করার ঘোষণা দিয়ে রাজনৈতিক মাঠ দখলে রাখার ঘোষণা দিয়ে রেখেছে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন ১৪ দলীয় জোট। এতে রাজধানীর সর্বস্তরের জনসাধারণের মধ্যে শঙ্কা ও আতঙ্ক দেখা দিয়েছে যে, তাহলে সামনের দিনগুলোতে কী ঘটতে যাচ্ছে?

বিএনপি সংশ্লিষ্টদের ভাষ্য, এই মুহূর্তে দেশে যে পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে, তাতে আওয়ামী লীগ নিরাপদ প্রস্থানের রাস্তাও পাচ্ছে না। যদিও বিএনপির পক্ষ থেকে খালেদা জিয়া কারাবন্দী হওয়ার আগে-পরে আশ্বাস দেওয়া হয়েছে, বিএনপিকে আওয়ামী লীগ যেভাবে ধরপাকড়াও করেছে; বিএনপি রাষ্ট্র পরিচালনায় এলে আওয়ামী লীগকে সেভাবে পাকড়াও করবে না।

বিএনপি নেতারা বলছেন, গত ১০ বছর ধরে বিএনপির নেতাকর্মীদের ওপর যেভাবে গ্রেফতার, নির্যাতন, হামলা, মামলা করা হয়েছে, তাতে বিএনপি প্রতিশোধের পথ বেছে নিতে পারে- এই ভয়ের কারণেই কি দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচন দিতে মরিয়া হয়ে উঠেছে আওয়ামী লীগ? নাকি এখনই বিএনপিকে রাজপথে কর্মসূচি পালনের অনুমতি দিলে সামনে তাদেরকে আরও বেশি সমস্যায় পড়তে হবে, সেটা নিয়ে কোণঠাসা হয়ে পড়েছে আওয়ামী লীগ?

বিএনপির মূল দাবি, খালেদা জিয়ার মুক্তি ও নির্বাচনকালীন যে সরকারই হোক না কেন, সরকারের প্রধান হিসেবে শেখ হাসিনা তো নয়ই, এমনকি দলীয় কাউকে মানা হবে না। নির্বাচনকালীন সরকারপ্রধান নির্দলীয় হতে হবে। অন্যদিকে ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন জোট অনেক আগেই বিএনপিসহ বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনকালীন সরকারের দাবি প্রত্যাখান করে আসছে। তারা দলীয় সরকারের অধীনে নির্বাচনের সিদ্ধান্তে অটল রয়েছে।

বিএনপির কেন্দ্রীয় দফতর সূত্রে জানা যায়, নির্দলীয় সরকারের অধীনে জাতীয় নির্বাচন ও খালেদা জিয়ার মুক্তিসহ বেশ কয়েকটি প্রস্তাবের আলোকে আগামীকাল রবিবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানের জনসভা থেকে আগামীর আন্দোলেন-সংগ্রামের বার্তা দিতে চায় বিএনপি। সেই লক্ষ্যে ইতোমধ্যে প্রস্তুতিও প্রায় শেষ পর্যায়ে নিয়ে আসা হয়েছে। এমনকি বিএনপির প্রস্তাবিত রূপরেখার আলোকে দিকনির্দেশনামূলক বক্তব্য দেবে দলের নীতিনির্ধারণী নেতারা, যাতে করে পরবর্তী আন্দোলন কর্মসূচি বাস্তবায়নে নেতাকর্মীরা সক্রিয়ভাবে অংশ নেওয়ার প্রস্তুতিও নিয়ে রাখতে পারে।

সর্বশেষ ২০১৭ সালের ১২ নভেম্বর সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জাতীয় বিপ্লব ও সংহতি দিবস উপলক্ষে জনসভা আয়োজন করেছিল বিএনপি। এতে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য দেন বিএনপির চেয়ারপারসন খালেদা জিয়া। গত ৮ ফেব্রুয়ারি জিয়া অরফানেজ ট্রাস্ট মামলায় সাজাপ্রাপ্ত হয়ে খালেদা জিয়া কারান্তরীণ হওয়ার পর বেশ কয়েকবার সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে জনসভা করার অনুমতি চেয়েও পায়নি বিএনপি।

সূত্র: প্রিয় ডটকম।

print

Leave a Reply