রেলে নাশকতা ঠেকাতে বিশেষ পরিকল্পনা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রেলে আবার নাশকতার ঘটনা ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। এর আগে দুটি জাতীয় সংসদ নির্বাচনে রেলে ব্যাপক নাশকতা চালানো হয়েছিল। হরতাল ও অবরোধের নামে মাইলের পর মাইল রেললাইন উপড়ে ফেলাসহ লাইন কেটে ফেলা হয়েছিল।ইঞ্জিন, যাত্রীবাহী বগি, ব্রিজ, রেলস্টেশনে অগ্নিসংযোগ করা হয়েছিল। এতে প্রায় দেড় হাজার কোটি টাকার ক্ষতি হয়েছে। যাত্রীসেবাও মারাত্মক ব্যাহত হয়েছিল। গোয়েন্দা প্রতিবেদন অনুযায়ী, এবার নাশকতা রোধে রেল কর্তৃপক্ষকে কঠোর অবস্থান নিতে হবে।
গোয়েন্দা রিপোর্ট ও অতীত অভিজ্ঞতার আলোকে আগাম সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিতে যাচ্ছে রেলওয়ে কর্তৃপক্ষ। নাশকতা রোধে কঠোর অবস্থানে থাকবে রেল। রেলওয়ে কর্তৃপক্ষের বক্তব্য, এবার সর্বশক্তি দিয়ে যে কোনো নাশকতা প্রতিহত করা হবে। নাশকতাকারীদের বিরুদ্ধে সর্বোচ্চ ব্যবস্থা নেয়া হবে।ইঞ্জিন, বগি, ব্রিজ, স্টেশন ও লাইন রক্ষায় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অস্ত্রধারী সদস্যরা কঠোর অবস্থানে থাকবেন। ইতিমধ্যে ৬৫০টি ঝুঁকিপূর্ণ স্পট চিহ্নিত করা হয়েছে। ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলোসহ পুরো রেলে ৩১ হাজার ৪০৭ জন সদস্য মোতায়েনের পরিকল্পনা চূড়ান্ত করা হয়েছে।প্রয়োজনে আরও ১২-১৫ হাজার সদস্য মোতায়েন করা হবে। সম্প্রতি রেলপথ মন্ত্রণালয়ে এক বিশেষ বৈঠকে এমন সিদ্ধান্ত নেয়া হয়। জানা গেছে, আগের নির্বাচনগুলোতে প্রায় ৯ হাজার আনসার-ভিডিপি সদস্য মোতায়েন করা হয়েছিল।
রেলপথ সচিব মো. মোফাজ্জেল হোসেন জানান, নাশকতা ছাড়াও যে কোনো অপকর্ম প্রতিহত করতে সংশ্লিষ্টরা সতর্কাবস্থায় রয়েছে। আগামী জাতীয় সংসদ নির্বাচন কেন্দ্র করে রেলে কোনো নাশকতা করার চেষ্টা হলে তা সর্বোচ্চ শক্তি দিয়ে প্রতিহত করা হবে। ইতিমধ্যে এ সংক্রান্ত একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কোনো অবস্থায়ই যেন রেলে কেউ নাশকতা করতে না পারে, সে জন্য আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সদস্যদের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে। তিনি আরও বলেন, এ জন্য স্থানীয় প্রশাসন, জনপ্রতিনিধি, দেশপ্রেমিক সচেতন লোকজনের সমন্বয়ে বারবার বৈঠক করা হচ্ছে।
এ বিষয়ে অতিরিক্ত মহা-পুলিশ পরিদর্শক (রেলওয়ে পুলিশ) মোহাম্মদ আবুল কাশেম বিপিএম জানান, রেল গণমানুষের পরিবহন। রাজনৈতিক সহিংসতা, হরতাল-অবরোধে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক থাকে। রেলই গণমানুষের একমাত্র আস্থা ও নিরাপদ বাহন হয়ে দাঁড়ায়। এ জন্য রেলে নাশকতা করা হলে কাউকে বিন্দুমাত্র ছাড় দেয়া হবে না। ইতিমধ্যে ঝুঁকিপূর্ণ স্পটগুলো চিহ্নিত করা হয়েছে।
তিনি বলেন, নাশকতা প্রতিহত করতে যা যা করা দরকার তাই করা হবে। রেলের একটি ছক তৈরি করা হয়েছে। ছক অনুযায়ী উনিশ থেকে বিশ হলেই অ্যাকশনে যাবেন নিরাপত্তা কর্মীরা।
রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সভাপতি অ্যাডভোকেট হুমায়ুন কবির জানান, বিভিন্ন সময় রেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালানো হয়েছে। বিশেষ করে ২০১৩-১৪ সালে জামায়াত-বিএনপি ও তাদের দোসররা রেলে ব্যাপক ধ্বংসযজ্ঞ চালায়। ওই সময় আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সঙ্গে জীবন বাজি রেখে রেলওয়ে শ্রমিক লীগের সদস্যরা নাশকতা প্রতিহত করেছে।তিনি বলেন, ইতিমধ্যে সংগঠনের ৬০টি শাখায় লিখিতভাবে জানিয়ে দেয়া হয়েছে।
পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের পুলিশ সুপার নওরোজ হাসান তালুকদার জানান, ইতিমধ্যে একটি ছক তৈরি করা হয়েছে। কোনো অবস্থায়ই নির্বাচন কিংবা যে কোনো সময় রেলে নাশকতা করতে দেয়া হবে না। রেলে জ্বালাও-পোড়াও ভাংচুর করে কেউ পার পাবে না। আমাদের যে লোকবল রয়েছে তার সঙ্গে অতিরিক্ত লোকবলও সংযুক্ত করা হচ্ছে।
তিনি বলেন, রেল সাধারণ মানুষের পরিবহন, তাহলে রেলে কেন নাশকতা হবে? সাধারণ মানুষের জানমাল রক্ষা তথা সরকারি সম্পদ রক্ষা করতে যা যা প্রয়োজন তাই করা হবে। পূর্বাঞ্চল রেলওয়ের প্রতিটি জায়গা নিরাপত্তার চাদরে ঢেকে দেয়া হবে। স্থানীয় প্রশাসন ও জনপ্রতিনিধিসহ সচেতন মহলের লোকজন নিয়ে যে কোনো নাশকতা প্রতিহত করব।
রেলওয়ে হেডকোয়ার্টার পুলিশ সুপার (অপারেশন) নিগার সুলতানা জানান, ইতিমধ্যে রেলওয়ের স্ব স্ব থানা ও এলাকায় বার্তা পৌঁছে গেছে। নাশকতা প্রতিহত করতে নানা কৌশল অবলম্বন করা হয়েছে। কৌশল বাস্তবায়নে সংশ্লিষ্টরা সতর্কাবস্থায় রয়েছে। ট্রেন, স্টেশন, লাইন, ব্রিজসহ রেলওয়ে স্থাপনা রক্ষায় আমরা সম্মিলিতভাবে কাজ করছি। ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের নির্দেশনা অনুযায়ী মাঠপর্যায়ে সব ধরনের প্রস্তুতিসম্পন্ন করা হচ্ছে।
মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রেলস্টেশনসহ বিভিন্ন স্থাপনা, রেললাইন, ব্রিজ, ইঞ্জিন ও বগি রেল রেলকর্মী ও যাত্রীদের সুরক্ষায় বিশেষ পদক্ষেপ নিয়েছে রেল কর্তৃপক্ষ। ইতিমধ্যে একজন অতিরিক্ত সচিবকে (আইন) প্রধান করে ১২ সদস্যের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটিতে রেলপথ মন্ত্রণালয়, জননিরাপত্তা বিভাগ, স্থানীয় সরকার বিভাগ, রেলওয়ে পুলিশ, আরএনবি, আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রতিনিধি রাখা হয়েছে। একই সঙ্গে লাইন সংলগ্ন জেলা উপজেলার জনপ্রতিনিধিদেরও সম্পৃক্ত করা হচ্ছে।
রেলওয়ে পুলিশ ও মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, রেলওয়ে নিরাপত্তা বাহিনী (আরএনবি) থেকে ১৭৭টি এবং জিআরপি থেকে ১৮০টি স্থানসহ ৩৫৭ স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলে ৭৬টি রেলস্টেশন, ১৯টি সেকশন, ১১৯টি ব্রিজ, ১৩টি লোকোশেড, ৪১টি আন্তঃনগর ট্রেন ও ১০টি অফিসসহ ৩৪৪টি স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। আর পশ্চিমাঞ্চলে ৬৫টি রেলস্টেশন, ২৪টি সেকশন, ১৯টি ব্রিজ, ৫টি লোকোশেড, ইঞ্জিনসহ ২৬৮টি স্থাপনা ঝুঁকিপূর্ণ বলে চিহ্নিত করা হয়েছে। পূর্বাঞ্চলে ৬ হাজার ৮৯০ জন ও পশ্চিমাঞ্চল ৬ হাজার ১৪ জন নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েনের প্রস্তাব করা হয়েছে। এ ছাড়া পুরো রেলে ৩১ হাজার ৪০৭ জন নিরাপত্তা সদস্য মোতায়েন থাকবে।
রেলপথ মন্ত্রণালয় ও রেলওয়ে অপারেশন বিভাগ সূত্র জানায়, রাজনৈতিক সহিংসতাকে কেন্দ্র করে ২০১৩ সালের ২ এপ্রিল কুমিল্লা দক্ষিণ উপজেলার শ্রীমন্তপুর এলাকায় জামায়াত-বিএনপি সমর্থিত নাশকতাকারীরা প্রায় ৫০০ গজ রেললাইন উপড়ে ও কেটে ফেলে। ওই সময় ঢাকা-চট্টগ্রামগামী তূর্ণা-নিশীথা এক্সপ্রেস ট্রেনের ইঞ্জিনসহ ১১টি বগি লাইনচ্যুত হয়। এতে বহু ট্রেনযাত্রী আহত হন। লাইনচ্যুত হওয়া ইঞ্জিন ও বগিগুলো আজও যথাযথভাবে মেরামত করা সম্ভব হয়নি। ২০১৪ সালের সহিংসতায় ১৭টি বগিতে অগ্নিসংযোগ করা হয়। লাইন উপড়ে ফেলায় ট্রেন লাইনচ্যুত হয়ে আটটি বগি ক্ষতিগ্রস্ত হয়। চারটি ইঞ্জিনে অগ্নিসংযোগ করা হয়। এ ছাড়া স্টেশন, লাইন ও ব্রিজে অগ্নিসংযোগের ঘটনা ঘটে।

print

Leave a Reply