বোমা’র ওপর বাস করছে পুরান ঢাকাবাসী

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা : ঐতিহ্যবাহী পুরনো স্থাপনা আর সরু অলিগলির জন্য পরিচিত বাংলাদেশের পুরাতন ঢাকার মানুষ শত শত রাসায়নিক গুদামের রূপে বোমা নিয়ে বাস করছে। একের পর এক আগুনের ঘটনা ঘটছে রাসায়নিক গোডাউনের কারণে। গত ২০১০ সালে প্রধানমন্ত্রী পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গোডাউন স্থানান্তরের নির্দেশ দিলেও এখনো ব্যবসায়ীদের তীব্র বিরোধিতার কারণে পুরান ঢাকার রাসায়নিক গোডাউন সরানো সম্ভাব হয়নি।
জানা গেছে, পুরান ঢাকার নিমতলীর ঘটনার পর আবার চকবাজার আগুনের ঘটনায় ৭৮ জন নিহত হয়েছিল। কিন্তু এতো মর্মান্তিক মৃত্যুতে কোনও পরিবর্তন আসেনি। সম্প্রতি গত ২৩ এপ্রিল ভোর রাতে পুরান ঢাকার আরমানিটোলায় একটি ৬তলা ভবনে আগুনের ঘটনায় ৫ জনের মৃত্যু হয়। ওই ভবনটির নিচতলায় রাসায়নিক গোডাউন ছিলো। ওই ভবনের নিচতলা থেকেই আগুনের সূত্রপাত হয়।
পুরান ঢাকার অনেক বাড়ির মালিক অধিক মুনাফা লাভের আশায় অনুমোদনহীনভাবে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাকে ভাড়া দিয়ে আসছেন। অথচ তাদের অনেকেই এখন এলাকা পরিবর্তন করে পরিকল্পিত এলাকায় ঝুঁকিমুক্ত ভবনে বসবাস করছেন। এই ভবন মালিকদের অচিরেই আইনের আওতায় না আনা হলে এই সংস্কৃতি চলতেই থাকবে। পাশাপাশি অনুমোদনহীন ও অবৈধভাবে আবাসিক ভবনে বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামজাতকারী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনা উচিত বলে মনে করেন সচেতন মহল।
কেরানীগঞ্জে বিসিক শিল্পনগরীর পাশে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে রাসায়নিক গুদাম সরানোর যে প্রস্তাবনা ছিল ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্লট ভিত্তিক শিল্প এলাকা তৈরি করে রাসায়ীনক গুদাম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেয়াটা রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের কাজকে বিলম্বিত করেছে।
অপরদিকে নগরবিদদের সংগঠনটি বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানাস মনে করছে রাসায়নিক গুদামের কারণে পুরান ঢাকার বাসিন্দারা ‘বোমা’র ওপর বসবাস করছেন। নিমতলী, চুড়িহাট্টা, আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ডগুলো দুর্ঘটনা না। ব্যবসায়ী ও বাড়ির মালিকদের অতি মুনাফার প্রবণতা এবং সরকারের সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর দায়িত্ব পালনে ব্যর্থতার সম্মিলিত ফলাফল।
সমসাময়িক পরিকল্পনা ও উন্নয়ন ব্যবস্থাপনা নিয়ে বৃহস্পতিবার অনলাইনে সংবাদ সম্মেলন করে বাংলাদেশ ইনস্টিটিউট অব প্ল্যানার্স (বিআইপি)। সংবাদ সম্মেলনে লিখিত বক্তব্য পড়েন সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক আদিল মুহাম্মদ খান।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, বারবার বলা সত্ত্বেও নিমতলী ট্র্যাজেডির ১১ বছর পরও পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরেনি। মানুষের জীবন ও সম্পদকে সর্বাধিক গুরুত্ব দেওয়া হলে এই পরিস্থিতি হওয়ার কথা না। মন্ত্রণালয় ও বিভিন্ন সংস্থাগুলোর সিদ্ধান্ত বাস্তবায়ন না হওয়ার পেছনে প্রভাবশালী মহল ও রাজনৈতিক সংশ্লিষ্টতার দায় আছে।
পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলোর অধিকাংশই ইমারত নির্মাণ বিধিমালা ও আদর্শগত মান অনুসরণ করে নির্মিত হয়নি বলে জানায় বিআইপি। সংবাদ সম্মেলনে বলা হয়, পুরান ঢাকায় বর্তমান পরিকল্পনা অনুসারে আবাসিক ও বাণিজ্যিক মিশ্র ব্যবহারের কোনো অনুমোদন নেই। অথচ এ ধরনের বিপজ্জনক বসবাস দীর্ঘদিন ধরে চলে আসছে।
লিখিত বক্তব্যে বলা হয়, নিমতলী ও চুড়িহাট্টা অগ্নিকাণ্ডের পর রাসায়নিক গুদামের ট্রেড লাইসেন্স দেওয়া বন্ধ করেছে সিটি করপোরেশন। পুরান ঢাকায় রাসায়নিক গুদাম ও কারখানাগুলোতে নজরদারি কার্যক্রম চালানোর দায়িত্ব ছিল সিটি করপোরেশন, ওয়ার্ড কাউন্সিলর অফিস, কলকারখানা অধিদপ্তর, রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ, বিস্ফোরক অধিদপ্তর এবং ফায়ার সার্ভিসসহ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানগুলোর। কিন্তু সংস্থাগুলো দায়িত্ব পালন করতে পারেনি।
গণমাধ্যমের তথ্য অনুযায়ী, পুরান ঢাকায় ২৫ হাজারের বেশি রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। এর মধ্যে অনুমোদিত মাত্র আড়াই হাজার। ২০১০ সালের ৩ জুন পুরান ঢাকার নিমতলীতে ঘটে স্মরণকালের ভয়াবহ অগ্নিদুর্ঘটনা। এতে প্রাণ হারান ১২৪ জন মানুষ। এর ৯ বছর পর ২০১৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি চকবাজারের চুড়িহাট্টায় ঘটে আরেক মর্মান্তিক ঘটনা। যাতে প্রাণ হারান ৮০ জনের বেশি। সর্বশেষ ঘটে আরমানিটোলার অগ্নিকাণ্ড। এ ছাড়া ছোটখাটো অনেক আগুন লাগার ঘটনা প্রায়ই ঘটে এই এলাকায়।
২০১১ সালে ঢাকা মহানগরের আবাসিক এলাকা থেকে অবৈধ রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কামরাঙ্গীরচর ও কেরানীগঞ্জে সরিয়ে নেওয়ার সিদ্ধান্ত হয়। ২০১৪ সালে সরকারি সিদ্ধান্ত ছিল, কেমিক্যাল পল্লিতে সাততলা ১৭টি ভবন তৈরি করে গুদাম সরানো হবে। পরের বছর কেরানীগঞ্জে ২০ একর জায়গায় পল্লি স্থাপন করার কথাও বলা হয়েছিল। কিন্তু বাস্তবতা হলো, এখনো পুরান ঢাকায় হাজার হাজার রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে এবং এর অধিকাংশই অবৈধ।
বিআইপি বলছে, কেরানীগঞ্জে বিসিক শিল্পনগরীর পাশে বহুতল ভবন নির্মাণের মাধ্যমে রাসায়নিক গুদাম সরানোর প্রস্তাবনা ছিল। কিন্তু ব্যবসায়ীদের চাপের মুখে সে সিদ্ধান্ত থেকে সরে এসে প্লটভিত্তিক শিল্প এলাকা তৈরি করে রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে, যা রাসায়নিক গুদাম স্থানান্তরের কাজকে বিলম্বিত করছে। অধিক মুনাফা লাভের আশায় যেসব বাড়ির মালিক অনুমোদনহীনভাবে রাসায়নিক গুদাম ও কারখানা ভাড়া দিয়েছেন এবং অবৈধভাবে আবাসিক ভবনে বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামজাতকারী ব্যবসায়ীদের আইনের আওতায় আনার দাবি জানিয়েছে সংগঠনটি।
বিআইপির পক্ষ থেকে বেশ কিছু অন্তবর্তীকালীন সমাধান তুলে ধরা হয়। তার মধ্যে রয়েছে পুরান ঢাকায় যত্রতত্র ছড়িয়ে থাকা অধিক বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামগুলোকে অবিলম্বে সরকারি-বেসরকারি শিল্প এলাকায় স্থানান্তর করা, তুলনামূলক কম বিপজ্জনক রাসায়নিক গুদামকে পুরান ঢাকার সুনির্দিষ্ট কিছু ভবনের মধ্যে স্থানান্তর করা, আবাসিক ভবনে রাসায়নিক গুদাম বা কারখানা অনুমোদন দেওয়া যাবে না, রাসায়নিক উপাদান উৎপাদন, বিপণন, বিক্রি ও গুদামজাত করার বিষয়ে একটি সুস্পষ্ট নীতিমালা প্রণয়ন করা অন্যতম।
এ বিষয়ে ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের প্রধান নির্বাহী (সিইও) এবং সদ্য নতুন নিয়োগপ্রাপ্ত রাজউকের চেয়ারম্যান এবিএম আমিনুল্লাহ নুরী জানান, পুরান ঢাকার রাসায়নিক গুডাউন স্থানান্তরের জন্য সরকার শিল্প মন্ত্রণালয়ের অধীনে দুটি প্রকল্প হাতে নিয়েছিল। দুটি প্রকল্প হলো মুন্সিগঞ্জ ও টঙ্গীতে। রাজউক চেয়ারম্যান আরো বলেন, সেই প্রকল্প দুটির মধ্যে টঙ্গীরটি এই বছরের মধ্যেই সম্পন্ন হবে বলে আশা করা হচ্ছে। এসব প্রকল্পের কাজ প্রায় শেষ পথে। প্রকল্প দুটি শেষ হলে পুরান ঢাকায় আর রাসায়নিক গোডাউন থাকতে পারবে না।

print

Leave a Reply