বাংলাদেশে মুজিববর্ষে একটি ঘরও অন্ধকার থাকবে না: প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: বঙ্গবন্ধুর জন্মশতবার্ষিকী ঘিরে আগামী বছর ‘মুজিববর্ষ’ উদ্যাপনকালে বাংলাদেশের প্রতিটি ঘরে বিদ্যুতের আলো জ্বালানোর প্রতিশ্রুতি পুনর্ব্যক্ত করেছেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। তিনি বলেন, ‘শুধু পার্বত্য চট্টগ্রাম নয়, বাংলাদেশের একটি ঘরও অন্ধকার থাকবে না। প্রতিটি ঘরে আলো জ্বলবে। কাজের গতি বাড়বে, সময় বাড়বে। বিদ্যুতের আলোয় কাজ হবে।’ বৃহস্পতিবার সকালে প্রধানমন্ত্রী তাঁর সরকারি বাসভবন গণভবন থেকে ভিডিও কনফারেন্সের মাধ্যমে চারটি উন্নয়ন প্রকল্পের উদ্বোধনকালে এসব কথা বলেন। প্রকল্পগুলো হলো—পার্বত্য চট্টগ্রামের প্রত্যন্ত এলাকায় সোলার প্যানেল স্থাপনের মাধ্যমে বিদ্যুৎ সরবরাহ (১ম সংশোধিত) শীর্ষক প্রকল্পের অধীনে সৌরবিদ্যুৎ সুবিধার ব্যবস্থা; বঙ্গবন্ধু হাইটেক সিটি, কালিয়াকৈর, গাজীপুরে নির্মিত ‘ফোর টায়ার ন্যাশনাল ডাটা সেন্টার’; চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সায়েন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়ের উদ্যোগে কাপ্তাই লেকে নির্মিত ভ্রাম্যমাণ গবেষণা তরি (রিসার্চ ভেসেল) এবং বাংলাদেশ শিপিং করপোরেশনের পাঁচটি নতুন জাহাজ।
শেখ হাসিনা বলেন, পার্বত্য চট্টগ্রাম একসময় অশান্ত ছিল। ১৯৯৬ সালে ক্ষমতায় আসার পর শান্তিচুক্তির মাধ্যমে তাঁর সরকার এ সমস্যার সমাধান করেছে এবং একসময়ের অন্ধকার পার্বত্য চট্টগ্রামে এখন বিদ্যুতের আলো ছড়াচ্ছে। তিনি বলেন, ‘শান্তিচুক্তির মাধ্যমে পার্বত্য চট্টগ্রামে শান্তি ফিরে এসেছে। সেখানকার এক হাজার ৮০০ অস্ত্রধারী আত্মসমর্পণ করেছে। তাদের আমরা পুনর্বাসন করেছি।’ প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিএনপির আমলে পার্বত্য চট্টগ্রামে মোবাইল ফোন ব্যবহার নিষিদ্ধ ছিল। এখন সেখানে উন্নয়নের ঢেউ উঠেছে। সোলার বিদ্যুৎ ব্যবহারের ফলে সেখানে রাত-দিন কাজ হচ্ছে। অর্থনীতিতে গতিসঞ্চার হচ্ছে।
২০০৮ সালে নির্বাচনী ইশতেহারে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ে তোলার ঘোষণার কথা স্মরণ করে বিএনপির সাবেক এক মন্ত্রীর সমালোচনা করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘ছিয়ানব্বই সালে যখন সরকারে এসেছিলাম তখন দেখতাম কেউ কম্পিউটার ব্যবহার করে না। মোবাইল ফোন তো কারো হাতে ছিলই না। বিএনপি সরকারের একজন মন্ত্রী ছিলেন তাঁর মোবাইল ফোনের ব্যবসা ছিল বলে ওই একটা কম্পানিই ব্যবসা করত। বাংলাদেশে আর কোনো কম্পানি ব্যবসা করতে পারবে না, এটা একটা অলিখিত, অঘোষিত ঘটনা। তাঁর সেই মোবাইল ফোনটা বিশালাকারের এক ফোন, আর সেটা শুধু ঢাকা-চট্টগ্রামে। কারণ ওই ভদ্রলোকের বাড়ি ছিল চট্টগ্রামে। ঢাকা-চট্টগ্রামের মধ্যেই সংযোগ ছিল, আর কোথাও ছিল না। এই ধরনের একটা অবস্থা ছিল।’
ছিয়ানব্বই সালে সরকারে এসে মোবাইল ফোন বেসরকারি খাতে উন্মুক্ত করে দেওয়ার কথা জানিয়ে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘পাশাপাশি কম্পিউটার…কম্পিউটার কেউ তখন ব্যবহারই করত না। অনেক অফিসে একটা ডেস্কটপ সাজিয়ে রাখা হতো। কিন্তু কেউ ওটায় হাত দিত না এমন একটা অবস্থা ছিল।’ শেখ হাসিনা ওই সময় নিজের ছেলে বর্তমানে তাঁর তথ্য-প্রযুক্তি বিষয়ক উপদেষ্টা সজীব ওয়াজেদ জয়ের কাছ থেকে পাওয়া পরামর্শের কথাও জানান। তিনি বলেন, ‘আমাকে সজীব ওয়াজেদ জয় বলল তুমি যদি এটা (ডিজিটাল বাংলাদেশ) করতে চাও মা, তাহলে (কম্পিউটার ও কম্পিউটার সরঞ্জামের ওপর) ট্যাক্স কমিয়ে দিতে হবে। এটার দাম কমাতে হবে এবং শিক্ষার জন্য ট্রেনিংয়ের ব্যবস্থা করতে হবে।’ তিনি আরো বলেন, ‘২০০৯-এ আবার সরকারে আসার পর আমরা উদ্যোগ নিলাম। আজকে সারা বাংলাদেশে আমরা যেটা বলেছিলাম ডিজিটাল বাংলাদেশ করব, সত্যি আমরা ডিজিটাল বাংলাদেশ প্রতিষ্ঠা করতে পেরেছি।’
১৯৯৬-২০০১ সরকারের মেয়াদের শেষ দিকে নেওয়া প্রকল্পের প্রসঙ্গ টেনে শেখ হাসিনা বলেন, ‘এখানে একটা দুঃখজনক ঘটনা না বলে পারছি না। আমরা চাইলাম কম্পিউটার আমাদের স্কুলের ছেলে-মেয়েদের দেব। আমার আগ্রহ দেখে নেদারল্যান্ডস গভর্নমেন্ট এগিয়ে এলো। তারা আমাকে বলল, তারা আমাদের অর্ধেক দামে…অর্ধেক তারা অনুদান দেবে, অর্ধেক দাম আমরা দেব। সেইভাবে ১০ হাজার কম্পিউটার তারা আমাদের দেবে। আমাদের সঙ্গে অন্যান্য সংস্থাও এলো। তারাও অর্থ সহায়তা দিল। এই কম্পিউটার কিনব বলে নেদারল্যান্ডস সরকারের সঙ্গে আমাদের চুক্তি হয়ে গেল। তারা সমস্ত কিছু দেবে। সব কিছু ঠিক হয়ে গেল, টাকা-পয়সা দিয়ে দেওয়া হলো।’ এর কিছুদিন পরই ২০০১ সালে আওয়ামী লীগ সরকার বিদায় নিলে সরকারে আসে বিএনপি-জামায়াত জোট সরকার। শেখ হাসিনা বলেন, ‘আপনারা জানেন, নেদারল্যান্ডসের জাতীয় ফুল হচ্ছে টিউলিপ। টিউলিপ ফুলটা ওদের দেশে খুব ভালো হয়। খালেদা জিয়াকে বোঝালো যে ওখানে যে আমরা কম্পানির কম্পিউটার কিনব, সেই কম্পানির নাম টিউলিপ। এই টিউলিপ নাম নিয়ে হলো বিভ্রান্ত। কী বিভ্রাট? সেটা হলো খালেদা জিয়াকে বোঝানো হলো যে শেখ রেহানার মেয়ের নাম টিউলিপ, নেদারল্যান্ডসের ওই কম্পানি, ওটার নামও টিউলিপ। যেহেতু এই কম্পানির নাম টিউলিপ, কাজেই ওদের থেকে কম্পিউটার নেওয়া যাবে না। শুধু এখানে অপরাধটা হলো শেখ রেহানার মেয়ের নাম টিউলিপ আর নেদারল্যান্ডসের কম্পানির নাম টিউলিপ। সে জন্য সেটা বন্ধ করে দিল।’
প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘নেদারল্যান্ডসের টিউলিপ কম্পানি বাংলাদেশ সরকারের বিরুদ্ধে মামলা করল। সেই মামলায় বাংলাদেশ হারল। ১০ হাজার কম্পিউটার তো গেলই, ৩২ কোটি টাকা ক্ষতিপূরণও দিতে হলো। এক নামের প্রতি খালেদা জিয়া প্রতিহিংসার বশবর্তী হয়ে বাংলাদেশের ৩২ কোটি টাকা গচ্চা দিল। আর টিউলিপকে যে টাকাটা আমরা দিয়েছিলাম, তা-ও গেল। এভাবে সমস্ত লোকসান হলো। বাংলাদেশ আমরা যতটুকু এই ডিজিটাইজ করার ব্যবস্থা বা কম্পিউটার শেখানোর ব্যবস্থা করে গিয়েছিলাম, সেটা ওখানেই বলতে গেলে থেমে গেল।’ তিনি বলেন, ‘আমরা বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্ক করেছি, সমগ্র দেশে ২৮টি আইটি পার্ক হচ্ছে, পাশাপাশি সমগ্র দেশে আমরা কম্পিউটার প্রশিক্ষণের উদ্যোগ গ্রহণ করেছি। সারা দেশে ডিজিটাল সেন্টারের মাধ্যমে এবং ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেট সেবা প্রদানের উদ্যোগ গ্রহণ করে কম্পিউটারকে জনগণের নাগালের মধ্যে নিয়ে গেছি।’ কম্পিউটার প্রযুক্তির উৎকর্ষের এই যুগে ডাটা প্রসেসিং এবং সংরক্ষণের ওপর গুরুত্বারোপ করে প্রধানমন্ত্রী বলেন, ‘এর জন্যই বঙ্গবন্ধু হাইটেক পার্কে অত্যাধুনিক ফোর টায়ার ডাটা সেন্টার নির্মাণ করা হয়েছে। এর মাধ্যমে ডিজিটাল বাংলাদেশ গড়ার পথে আরেকটি ধাপে আমরা উপনীত হলাম।’

print

Leave a Reply