ডায়েরিতে সায়েমের সঙ্গে পরিচয় প্রণয় ও করুণ পরিণতির বর্ণনা

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা : ঢাকার গুলশানে ফ্ল্যাটে মোসারাত জাহান মুনিয়ার মৃত্যু এখন ‘টক অব দ্য কান্ট্রি’। সেই ফ্ল্যাটে মুনিয়ার লিখা ৬টি ডায়েরি পাওয়ার কথা জানিয়েছে পুলিশ। ওই ডায়েরিতে মুনিয়া লিখে গেছেন গুরুত্বপূর্ণ সব ঘটনা। তবে মোসারাত জাহান মুনিয়ার মরদেহে গলায় ফাঁসের দাগ ছাড়া শরীরের আর কোথাও আঘাতের কোনও চিহ্ন পায়নি পুলিশ। তার গলার বাম পাশে গভীর কালো দাগ পেয়েছে পুলিশ। কুমিল্লা নগরীর টমছমব্রিজ কবরস্থানে বাবা-মায়ের কবরের পাশে শায়িত হয়েছেন মোশারাত জাহান মুনিয়া। গত মঙ্গলবার বাদ আছর নামাজে জানাজা শেষে পরিবারিক কবরস্থানে তাকে শায়িত করা হয়।
পুলিশ জানিয়েছে, মুনিয়ার লিখা ৬টি ডায়েরিই তীব্র অভিমান আর ক্ষোভে ঠাসা। ডায়েরিগুলোর পাতায় লিখে রেখেছেন জীবনে ঘটে যাওয়া নানা ঘটনাবলি। বসুন্ধরা গ্রুপের এমডি সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে কিভাবে পরিচয়, পরিচয় থেকে কিভাবে প্রণয় এবং সবশেষ করুণ পরিণতির কারণও ডায়েরিতে লিখে গেছেন মুনিয়া। গত সোমবার সন্ধ্যায় গুলশান ২ নম্বরের ১২০ নম্বর সড়কের ফ্ল্যাট থেকে মুনিয়ার ফ্যানের সঙ্গে ঝুলন্ত লাশ উদ্ধার করে পুলিশ। গত সোমবার রাতেই রাজধানীর গুলশান থানায় ৩০৬ ধারায় ‘আত্মহত্যায় প্ররোচনা দেয়া’র অভিযোগে বসুন্ধরার এমডি সায়েম সোবহান আনভীর বিরুদ্ধে মামলা করেন মোসারাতের বড় বোন নুসরাত জাহান। মামলা নম্বর-২৭। এরপরই এ ঘটনায় তোলপাড় শুরু হয়। এরইমধ্যে আদালত সায়েমের দেশত্যাগে নিষেধাজ্ঞা জারি করেছে।
গত মঙ্গলবার সন্ধ্যায় পুলিশের গুলশান জোনের উপকমিশনার (ডিসি) সুদীপ কুমার চক্রবর্তী গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন, ওই ফ্ল্যাট থেকে তরুণীর মৃতদেহ উদ্ধারের পর সেখান থেকে তার মোবাইলসহ বিভিন্ন ধরনের আলামত উদ্ধারের সাথে ৬টি ডায়েরি পাওয়া গেছে। এসব ডায়েরিতে কী লিখা আছে, তা যাচাই করা হচ্ছে। মুনিয়ার বোনের করা মামলার অভিযোগে বলা হয়, সায়েম সোবহান আনভীরের সঙ্গে প্রেমের সম্পর্ক ছিল মুনিয়ার। গুলশানের ওই বাসায় আনভীরের যাতায়াত ছিল। তবে এসব বিষয়ে সায়েমের কোনও বক্তব্য এখনও গণমাধ্যমে আসেনি। ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী জানান, ওই ফ্ল্যাটে মুনিয়া একা থাকার কথা বলা হলেও কে কে আসা যাওয়ার মধ্যে থাকতো, তা জানতে ভবনের সিসিটিভি ফুটেজ সংগ্রহ করা হয়েছে। উদ্ধার হওয়া ডায়েরির সাথে সেগুলো যাচাই চলছে। মুনিয়ার মৃত্যু কী হত্যা নাকি আত্মহত্যা, তা নিশ্চিত হতে ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের অপেক্ষায় রয়েছে বলেও জানান তিনি। এই পুলিশ কর্মকর্তা বলেন, আমরা ময়নাতদন্ত প্রতিবেদনের জন্য অপেক্ষা করছি। আপাতত হ্যাংগিং মনে হলেও প্রতিবেদন থেকে জানা যাবে, কীভাবে তার মৃত্যু হয়েছে। এরপরই তদন্তের গতি নির্ধারণ হবে। এখন আমরা অ্যাভিডেন্স কালেকশন করছি। গত মঙ্গলবার ময়নাতদন্তের পর মরদেহ গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায় নেয়া হয় এবং সেখানে বাবা-মায়ের কবরের পাশেই মুনিয়াকে দাফন করা হয়।
মুনিয়ার বড় বোন নুসরাত জাহান তানিয়া কুমিল্লায় সাংবাদিকদের জানিয়েছেন, মুনিয়া ডায়েরি লিখতো। সেখান থেকে অনেক তথ্য পাওয়া যেতে পারে। মুনিয়া ঢাকার একটি কলেজের দ্বিতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী ছিল। তার গ্রামের বাড়ি কুমিল্লায়। বাবা বীর মুক্তিযোদ্ধা শফিকুর রহমান। মেয়েটির পরিবার কুমিল্লায় থাকে। এখানে গুলশানের ওই ফ্ল্যাটে তিনি একাই থাকতেন।
এ বিষয়ে ডিসি সুদীপ কুমার চক্রবর্তী বলেন, সায়েম সোবহান দেশের বাইরে চলে গেছেন কিনা, এ ব্যাপারে আমাদের পক্ষ থেকে ইমিগ্রেশনে খোঁজ নেয়া হচ্ছে। ইমিগ্রেশন কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে সায়েম দেশের বাইরে যাননি।
তবে গুলশান থানার উপপরিদর্শক শামীম হোসেন জানিয়েছেন, এএসআই আব্দুল রশিদ, গোলাম মোস্তফা, জান্নাতুল ফেরদৌসসহ নুসরাত জাহান ও ফারহানা সুলতানার সহায়তায় মেয়েটির মরদেহ ঝুলন্ত অবস্থা থেকে নামানো হয়। সুরতহাল প্রতিবেদনে বলা হয়, জিহ্বা মুখ থেকে বাইরে ছিল। গলার বাম পাশে অর্ধচন্দ্রাকৃতির গভীর কালো দাগ দেখা যায়। হাত দুটি শরীরের সঙ্গে লম্বালম্বি অর্ধমুষ্টি ছিল।
গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) আবুল হাসান মামলাটির তদন্ত করছেন। এরইমধ্যে ঘটনাস্থল থেকে সিসিটিভির ফুটেজ ও মুনিয়ার ব্যবহৃত ডিজিটাল ডিভাইসগুলো সংগ্রহ করা হয়েছে।
এদিকে ছোটবোনের মৃত্যুর ঘটনায় মামলার বাদী নুসরাত জাহান গণমাধ্যমের কাছে মুখ খুলেছেন। এক ভিডিও সাক্ষাৎকারে মুনিয়ার সঙ্গে তার শেষ কথোপকথন ও বসুন্ধরা গ্রুপের এমডির সঙ্গে মুনিয়ার প্রেমের সম্পর্কের বিষয়ে বিস্তারিত জানান তিনি। মুনিয়া আত্মহত্যার দিন সকালে অর্থাৎ গত সোমবার সকালেই বোনকে ফোনে বিপদের আভাস দিয়েছিলেন-এ কথা উল্লেখ করে নুসরাত জাহান বলেন, গত সোমবার সকাল বেলা লাস্ট কথা হয়েছে। ওইদিন ও আমাকে ফোন করে, ওর ফোনের কান্নায় আমার ঘুম ভাঙে। ও ফোন দিয়ে বলে- আপু আমাকে ধোকা দিয়েছে, আপু আনভীর আমাকে ধোকা দিয়েছে। সে আমায় বলে- আপু আমি অনেক বিপদে আছি, তুমি তাড়াতাড়ি বাসায় আসো। আমি তাকে বুঝাই, বলি- তুমি একটু রেডি হও, তোমাকে এসে নিয়ে যাচ্ছি। কুমিল্লা নিয়ে আসবো। পরে ও বলে- আমি তো তোমার সাথে অভিমান করে চলে আসছি, এখন কীভাবে আসবো। ওর লজ্জা কাজ করছিল তো, আমি ওকে নরমাল করি। গত সোমবার বেলা ১১টার দিকে ও আমাকে কল করে বলে, আপু আমার অনেক বিপদ, তুমি কখন আসবা। যেকোনও সময় কিছু একটা হয়ে যাবে আপু।
নুসরাত আরো বলেন, ‘ও মরে গেছে। এ রমজান মাসে ওরে মাইরা ফেলছে, না হয় মরে গেছে, না হয় বাধ্য করছে। যেটাই করুক ওইটারই বিচার চাই। যেই করেছে আমি চাই বিচার হোক। আমি আপনাদের মাধ্যমে এটা সরকারকে বলতে চাই।’
এদিকে মোসারাত জাহান মুনিয়ার হত্যার অভিযোগে দায়ের করা মামলায় প্রতিবেদন দাখিলর জন্য আগামী ৩০ মে দিন ধার্য করেছেন আদালত। আদালতের সংশ্লিষ্ট থানার সাধারণ নিবন্ধন (জিআর) শাখা এ তথ্য নিশ্চিত করেছে।
গত মঙ্গলবার ঢাকা মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আবু সুফিয়ান মো. নোমানের আদালত মামলার এজহার গ্রহণ করেন। এরপর মামলাটি তদন্ত করে প্রতিবেদন দাখিল করার জন্য আগামী ৩০ মে দিন ঠিক করেন।

print

Leave a Reply