Warning: sprintf(): Too few arguments in /home/timesi/public_html/wp-content/themes/covernews/lib/breadcrumb-trail/inc/breadcrumbs.php on line 254

ভারতীয় পাঁচ কিশোরের এভারেস্ট জয়ের গল্প

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: জীবনে কোনো দিন মাউন্ট এভারেস্টের নাম শোনেনি, কোনো দিন নিজের গ্রামের বাইরে যায়নি–ভারতের মহারাষ্ট্রের প্রত্যন্ত এলাকার এমন পাঁচ কিশোর-কিশোরী পৃথিবীর সর্বোচ্চ শৃঙ্গ মাউন্ট এভারেস্ট জয় করে ইতিহাসের পাতায় নিজেদের নাম লিখিয়েছে। প্রায় ১০ মাসের কষ্টকর প্রশিক্ষণ ও অধ্যবসায় শেষে এ বছরের মে মাসে তারা এভারেস্টের চূড়ায় ভারতের পতাকা উড়াতে সক্ষম হয়। এ যেন এক দুঃসাহসিক সিনেমার গল্প! সীমাহীন দুঃসাহসিক কাজটি তারা করে ফেলেছে, এটি এখনো বিশ্বাস হচ্ছে না তাদের কারোরই। যেমন মণীষা ধ্রুভ বলছিল, ‘আমি এখনো নিজেকে চিমটি কেটে বুঝতে চাই যে, আসলেই আমি এটি করতে পেরেছি।’ ১৬ মে বিকাল ৪টা ৩০ মিনিটে মণীষা এভারেস্টের সর্বোচ্চ চূড়ায় আরোহন করে। তার জীবনে এমন অসাধারণ একটি মুহূর্ত আসবে, মাত্র এক বছর আগেও এটি ছিল মণীষার কাছে অকল্পনীয়, অবিশ্বাস্য। এভারস্টে ওঠার ঠিক পরমুহূর্তে কী মনে হয়েছিল? মণীষার উত্তর, ‘আমার বাবা-মা, ভাই-বোন, গ্রামবাসী, বাড়ি, বন, স্কুল, শিক্ষক, বন্ধু, দীর্ঘ প্রশিক্ষণ সবকিছু মনে পড়ছিল তখন।’ একেবারে শেষ ধাপে এসে একজনের মৃতদেহ দেখে থমকে দাঁড়ায় মণীষা। পরে তার শেরপা চিৎকার করে তাকে হাঁটা অব্যাহত রাখতে বলেন। এর কয়েক ঘণ্টা পর চূড়ায় পৌঁছায় সে। গ্রামের স্কুলপড়ুয়া কিশোর-কিশোরীদের এভাবে এভারেস্ট জয়ের ঘটনা অত্যন্ত বিরল।

মূলত মহারাষ্ট্রের চন্দ্রপুর জেলার একজন সরকারি কর্মকর্তা আশুতোষ সলিল প্রথম এ উদ্যোগ নেন। তিনি মহারাষ্ট্র সরকারকে তার পরিকল্পনায় রাজি করান এবং প্রকল্পের জন্য ৪ কোটি রুপি বরাদ্দ নিতে সক্ষম হন। পুরো জেলা থেকে প্রাথমিকভাবে ৪৭ জনকে বাছাই করা হয়। পরে তাদের মধ্য থেকে চূড়ান্ত ১০ জনকে এভারেস্ট অভিযানে পাঠানোর জন্য বাছাই করা হয়। এ ১০ জনের মধ্যে শেষ পর্যন্ত মণীষা ধ্রুভ, উমাকান্ত মাদভী, পরমেশ আলে, বিকাশ সোয়াম ও কাভিদাস কাতমোদ এভারেস্টের চূড়ায় উঠতে সক্ষম হয়। অন্য পাঁচজনের মধ্যে চারজন বিভিন্ন উচ্চতা থেকে অসুস্থ হয়ে নিচে নেমে আসে। আর ইন্দু কান্নাকে নামের আরেকজনকে তার শেরপা বাধ্য হয়ে ছেড়ে দেন, কারণ তাকে আরেক অভিযাত্রীর জীবন বাঁচাতে হয়েছিল। ইন্দু তখন চূড়া থেকে মাত্র ১৩০০ মিটার দূরে ছিল। অল্পের জন্য এভারেস্ট জয় মিস হওয়ার ব্যাপারে ইন্দু বলে, ‘প্রথমে কষ্ট লাগছিল। কিন্তু পরে যখন ভাবলাম অন্য একজনের জীবন বাঁচানোর জন্য এটি করতেই হতো, তখন আমি খুশি হয়েছি। সুযোগ পেলে আমি আবারও এভারেস্টে ওঠার চেষ্টা করব।’

মণীষাদের দলটিকে প্রশিক্ষণ দেন অভিনাষ দেওস্কার। তিনি বলেন, ‘আমরা বিভিন্ন স্কুলে ঘুরে ঘুরে এ অভিযানের জন্য শিক্ষার্থীদের বাছাই করছিলাম। আমার এখনো মনে আছে, মণীষাদের স্কুলে গিয়ে আমরা শিক্ষার্থীদের দৌড়াতে বলি এবং পরে তাদের থামার নির্দেশ দিতে ভুলে যাই। এক ঘণ্টা পর দেখি মণীষা তখনও দৌড়াচ্ছিল, কারণ আমরা তাকে থামতে বলিনি।’
মাউন্ট এভারেস্টের উচ্চতা ৮ হাজার ৮৪৮ মিটার। এভারেস্ট অভিযানকে পৃথিবীর অন্যতম সেরা দুঃসাহসিক অভিযান হিসেবে গণ্য করা হয়। সফলভাবে এ অভিযান সম্পন্ন করতে বহু মাসের কষ্টকর প্রশিক্ষণ ও শারীরিক সামর্থের দরকার হয়। এখন পর্যন্ত এভারেস্ট অভিযানে গিয়ে প্রাণ দিয়েছেন দুই শতাধিক অভিযাত্রী। মাত্র এক বছর আগেও এ কিশোর-কিশোরীদের কেউ কখনো তাদের গ্রামের বাইরেও যায়নি। অথচ আজ তাদের পদচিহ্ন বহন করছে এভারেস্ট। এ বিপদসংকুল যাত্রায় তাদের সামনে একমাত্র আদর্শ ছিল মালবত পূর্ণা নামের আরেক ভারতীয়, সে মাত্র ১৩ বছর বয়সে এভারেস্ট জয় করেছিল।পরমেশ আলে বলে, ‘একেবারে শেষ ধাপটি ছিল খবই সংকীর্ণ এবং ভয়াবহ। সামান্য একটা ভুল পদক্ষেপ নিলেই নিচে পড়ে যাওয়ার সম্ভাবনা ছিল।’ বিকাশকে দুইবার উঠতে হয়েছে। প্রথমবার ২১ হাজার ফুট ওঠার পর তার বন্ধুর জন্য আবারও নিচে নেমে আসতে হয়েছে। বিকাশ বলে, ‘আমার সঙ্গে থাকা বন্ধুটি অসুস্থ অনুভব করছিল। তাই আমি বেস ক্যাম্প ছেড়ে ২১ হাজার ফুট থেকে নিচে নেমে আসি। আমি আরও কিছুক্ষণ দেরি করলে আমার বন্ধুটি মারা যেতে পারত।’ কিন্তু এভারেস্ট জয়কে হাতের নাগালে রেখে ফেরত এলেও বিকাশ নিজের কাছে এত বেশি প্রতীজ্ঞাবদ্ধ ছিল যে, সে আবার এভারেস্ট অভিযান শুরু করে এবং এ যাত্রায় চূড়ায় উঠতে সক্ষম হয়। বিকাশের ভাষ্য, ‘আমি আমার স্বপ্নকে বিসর্জন দিতে প্রস্তুত ছিলাম না। তাই আবারও এভারেস্টে উঠি এবং এ যাত্রায় সফল হই।’ বেশির ভাগ অভিযাত্রীর মতো তারাও নেপাল অংশ দিয়ে এভারেস্টে আরোহণ করে এবং তাদের জন্য মহারাষ্ট্র সরকার ৪ কোটি রুপি বরাদ্দ করে। এ মৌসুমে তিন শতাধিক অভিযাত্রীকে এভারস্টে ওঠার অনুমতি দেওয়া হয়। চূড়ান্তভাবে যাচাই-বাছাইয়ের পর দলটিকে তেলেঙ্গানা রাজ্যের পাহাড়ি জেলা ভঙ্গির এবং দার্জিলিংয়ের হিমালয়ান মাউন্টেনিয়ারীয় ইনস্টিটিউটে প্রশিক্ষণ শুরু হয়। পরে উচ্চতার সঙ্গে খাপ খাওয়াতে তাদেরকে লাদাখ নেওয়া হয়। ১০ মাস ধরে চলে তাদের প্রশিক্ষণ। প্রশিক্ষণের অভিজ্ঞতা বর্ণনা করে কাভিদাস বলে, ‘আমি বহুবার পাহাড়ে ওঠা-নামা করেছি। ফলে পাহাড়ে চড়ার নানা খুঁটিনাটি খুব দ্রুত রপ্ত করতে পেরেছিলাম।’
এভারেস্ট অভিযান শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত কাভিদাসদের দলের সময় লেগেছে প্রায় এক মাস। এই এক মাস তাদেরকে স্বল্প অক্সিজেন, মাইনাস ৪৫ ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা, ক্লান্তি ও হ্যালুসিনেশনের মোকাবেলা করতে হয়েছে।প্রশিক্ষক দেওস্কার বলেন, ‘এ যাত্রায় বাচ্চাদের খাবার ও তাদের বিশ্রাম নিয়ে সবচেয়ে বেশি সংগ্রাম করতে হয়েছে। তাদেরকে প্রচুর শুকনো ফল ও বাদাম খেতে হয়েছে, যেটি আগে কখনো খায়নি তারা। সামান্য দুধ জোগাড় করাও ছিল তাদের পরিবারের জন্য কষ্টকর।’
কিন্তু তারা খুব দ্রুত নিজেদেরকে পরিস্থিতির সঙ্গে মানিয়ে নিতে সক্ষম হয়। সবচেয়ে বড় কথা হচ্ছে, তারা দলবদ্ধ থেকে কাজ করতে শিখে গিয়েছিল।ইন্দু কান্নাকেসহ যে পাঁচজন অভিযান শেষ করতে পারেননি, তাদেরকে সরকার এক লাখ রুপি করে পুরস্কার দিয়েছে। আর বিজয়ী দল পুরস্কার হিসেবে সরকারের কাছ থেকে পেয়েছে ২৫ লাখ রুপি।
এ অর্থ দিয়ে তরুণ-তরুণীদের অভাবের সংসারে সুদিন আসবে বলে আশা করা হচ্ছে। তবে বিজয়ী দলের সবাই বলছে, তাদের পরবর্তী লক্ষ্য মাউন্ট কিলিমাঞ্জারো জয়। এটি আফ্রিকা মহাদেশের সর্বোচ্চ পর্বতচূড়া।

সূত্র: প্রিয় ডটকম।

print

Leave a Reply