Warning: sprintf(): Too few arguments in /home/timesi/public_html/wp-content/themes/covernews/lib/breadcrumb-trail/inc/breadcrumbs.php on line 254

পুরান ঢাকায় কেমিক্যাল গোডাউনে ভয়াবহ আগুনে ৪ জনের মৃত্যু

এনামুল হক, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: রাজধানীর পুরান ঢাকার আরামানিটোলার হাজী মুসা ম্যানসনে রাসায়নিক গুদামে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় ৪ জনের মৃত্যু হয়েছে। ভয়াবহ আগুনে দগ্ধ ও ধোঁয়ার কারণে আহত অবস্থা ২১ জনকে শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে ভর্তি করা হয়েছে। আহতদের মধ্যে তিনজন ফায়ার সার্ভিস কর্মী চিকিৎসাধীন রয়েছেন। ভয়াবহ আগুনের ঘটনায় ৪ সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দেবে। তারপরেই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।
ফায়ার সার্ভিস সূত্রে জানা যায়, গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা ১৮ মিনিটে রাজধানীর পুরান ঢাকার আরমানিটোলার হাজী মুসা ম্যানসনে একটি ছয়তলা ভবনের নিচতলায় কেমিক্যাল গোডাউনে আগুন লাগে। ফায়ার সার্ভিসের ১৯টি ইউনিটের চেষ্টায় গতকাল শুক্রবার ৭টা ১২ মিনিটে আগুন নিয়ন্ত্রণে আনেন। ওই ভবনের পাশের একটি ভবনের একজন বাসিন্দা অভিযোগ করেন, ওই ভবনের নিচে রাসায়নিকের গুদাম রয়েছে। তার দাবি, আশপাশের প্রায় সব ভবনেই এ ধরনের গুদাম রয়েছে। কেমিক্যাল গোডাউনে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মৃত্যুর সংখ্যা বেড়ে ৪ জন হয়েছে। এতে দগ্ধ ও ধোঁয়ার কারণে অসুস্থ হয়ে পড়েছেন আরো অন্তত ৩৫ জন। আগুনে মারা যাওয়া ৪ জন হলেন ওই ভবনের কেয়ারটেকার রাসেল মিয়া, ইডেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার, হাজী ম্যানশনের সিকিউরিটি গার্ড ওলিউল্লাহ ব্যাপারী এবং তার আত্মীয় কবির।
চাঁদপুরের ফরিদগঞ্জের ছেলে রাসেল মিয়া ৮ বছর ধরে হাজী মুসা ম্যানশনের কেয়ারটেকার হিসেবে কর্মরত। ভবনের দ্বিতীয় তলায় থাকতেন তিনি। প্রতিদিনের মতো গত বৃহস্পতিবার রাতে ঘুমাতে গেলে ভোরে আগুন লাগে ওই ভবনে। আগুনের তীব্রতায় তিনি বাইরে বের হতে পারেনি। পরে আগুনে দগ্ধ হয়ে তার মৃত্যু হয়। খবর পেয়ে পরিবারের সদস্যরা ঘটনাস্থালে এসে কান্নায় ভেঙে পড়েন।
তারা বলেন, হাজী মুসা ম্যানশনে আগুন লেগেছে বলে আমরা সকালে সংবাদ পাই। এর পর পরই ঘটনাস্থলে আসি। আমরা শুনতে পাই, আগুনের তীব্রতায় রাসেল বাইরে বের হতে পারেনি। ভিতরেই দগ্ধ হয়ে মারা যায় সে। তারা বলেন, আমরা সবাই ঢাকায় কাজ করি। রাসেলের দুই মেয়ে। এক জনের তিন আরেকটির বয়স দুই বছর। আগুনের খবর পেয়ে চাঁদপুরে থাকা তার স্ত্রী বারবার ফোন দিচ্ছে। কী বলবো কিছুই বুঝতে পারছি না, কী সান্ত্বনা দেবো তাকে। নিহত রাসেলের বাবা চাঁদপুরে একটি টোং দোকান চালান।
ভবনের বাসিন্দারা বলেন, আগুন লাগার পর গার্ড রাসেল তিন তলায় এসে আমাদের ঘুম থেকে ওঠান। দরজা নক করে বলে আগুন লেগেছে আপনারা ছাদে যান। একথা বলে সে আবার নিচে চলে যায়। পরে জানতে পারি তার মরদেহ উদ্ধার করেছেন ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা। তারা জানান, দহ্য পদার্থ থাকায় আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে তা ছড়িয়ে পড়ে। আগুনের পাশাপাশি ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে পুরো ভবন।
হাজী মুসা ম্যানশনের চার তলায় থাকতেন ইডেন কলেজের ইংরেজি বিভাগের তৃতীয় বর্ষের শিক্ষার্থী সুমাইয়া আক্তার। পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে থাকতেন তিনি। ধোঁয়ার কারণে অচেতন হয়ে পড়লে ফায়ার সার্ভিস কর্মীরা তাকে উদ্ধার করে মিটফোর্ড হাসপাতালে নিয়ে যান। সেখানে পৌঁছালে চিকিৎসকরা তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
হাজী মুসা ম্যানশনের সিকিউরিটি গার্ড হিসেবে দায়িত্ব পালন করছিলেন ওলিউল্লাহ ব্যাপারী। ভবনের লাগা আগুনে দগ্ধ হয়ে তিনি মারা যান। কয়েকদিন আগে তার কাছ আসে এক আত্মীয় কবির। গতকাল শুক্রবার ভোরে লাগা আগুনে তিনিও মারা যান।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের আবাসিক সার্জন পার্থ শংকর পাল জানান, এ পর্যন্ত ২১ জন হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছে। বাকিদেও প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেয়া হয়েছে। হাসপাতালে যারা ভর্তি হয়েছেন তারা সবার শ্বাসকষ্টে ভুগছেন। একজনকে আইসিইউতে পাঠানো হয়েছে, বাকিদেরকে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।
শেখ হাসিনা জাতীয় বার্ন অ্যান্ড প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটের প্রধান সমন্বয়ক চিকিৎসক সামন্ত লাল সেন জানান, সেখানে চিকিৎসাধীন চারজনের শরীরের ২৫ শতাংশ দগ্ধ হয়েছে। তাদের নিবিড় পরিচর্যাকেন্দ্রে (আইসিইউ) রাখা হয়েছে।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক (অপারেশন অ্যান্ড মেইনটেন্যান্স) লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, আরমানিটোলায় একটি ছয়তলা আবাসিক ভবনের নিচতলায় আগুন লাগার খবর পেয়ে প্রথমে ফায়ার সার্ভিসের ৮টি ইউনিট কাজ শুরু করে। এরপর আগুনের তীব্রতা বৃদ্ধি পাওয়ায় আরো তিনটি ইউনিট যুক্ত হয়। এর কিছুক্ষণ পর আরো চারটি ইউনিট যুক্ত হয়েছে। মোট ১৯টি ইউনিট আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করে। ফায়ার সার্ভিসের পাশাপাশি আগুন নিয়ন্ত্রণে কাজ করেছে পুলিশ, র‌্যাব ও স্বেচ্ছাসেবীরা। প্রাথমিকভাবে আগুনের কারণ জানা যায়নি বলেও জানান তিনি।
অপর একটি সূত্র জানায়, হাজী মুসা ম্যানসনে দোতলা থেকে পাঁচতলা পর্যন্ত লোকজন বসবাস করে। গত বৃহস্পতিবার দিবাগত রাত ৩টা ১৮ মিনিটে আগুনের সূত্রপাত হলে ভবনের ছাদে কিছু লোক আটকা পড়ে। আগুন লাগার সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দ হয়ে বিদ্যুৎ চলে যায়। এতে বাসিন্দারা আটকে পড়েন। ঘটনার প্রত্যক্ষদর্শী ভবনের পাশের এটিএম বুথের নিরাপত্তারক্ষী বজলুর রহমান জানান, ভবনের নিচতলা ও দোতলার মাঝামাঝি জায়গায় সামনের দিকে বিকট শব্দ হয়। সামনে এসে দেখেন আগুন ধরে গেছে। তখন তিনি ও আরেকজন মিলে এই ভবনের কলাপ্সিবল গেটের তালা ভেঙে একজনকে বাইরে নিয়ে আসেন। এরপর ভেতরের দিকেও আগুন ধরে যাওয়ায় তারা সেখান থেকে সরে আসেন।
ভবনটিতে ১৮টি পরিবার বসবাস করে। অতিরিক্ত ধোঁয়ার কারণে আশপাশের ভবন থেকে বাসিন্দাদের সরিয়ে নেওয়া হয়। আটকে পড়া অনেককেই মুমূর্ষু অবস্থায় উদ্ধার করা হয়। গ্রিল কেটে, গ্রিল ভেঙে, জানালা ভেঙে, ছাদের দরজা ভেঙে আটকে পড়াদের উদ্ধার করেন ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা।
বংশাল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহীন ফকির জানান, ওই ভবনের ওপরের তলায় নিরাপত্তারক্ষীর কক্ষ থেকে তারা ওয়ালিউল্লাহ ও কবির নামের দুজনের মরদেহ উদ্ধার করেছেন। শুক্রবার বেলা সাড়ে ১১টার দিকে লাশ দুটি উদ্ধার করা হয়। এর আগে সকালে নিরাপত্তাকর্মী রাসেল ও সুমাইয়া নামে দুজনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়।
ফায়ার সার্ভিসের পরিচালক লেফটেন্যান্ট কর্নেল জিল্লুর রহমান জানান, শুক্রবার ভোররাত সোয়া তিনটার আগুন লাগে। ১৯টি ইউনিট তিন ঘণ্টার চেষ্টার পর গতকাল সকাল ৭টা ১২ মিনিটে আগুন পুরোপুরি নিয়ন্ত্রণে আনতে পেরেছে। পুরো ভবন তল্লাশি করে আর কাউকে পাওয়া যায়নি। ভবনের বাসিন্দাদের জানালার গ্রিল কেটে বের করে আনা হয়েছে। ধোঁয়ার কারণেই বেশির ভাগ মানুষ অসুস্থ হয়েছেন। আহতেরা ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতাল ও মিটফোর্ড হাসপাতালে চিকিৎসাধীন। শেখ হাসিনা বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে দুই থেকে তিনজন চিকিৎসাধীন। তিনি বলেন, অগ্নিকাণ্ডের কারণ এখনো বোঝা যায়নি। এ ঘটনায় ২১ জন আহত হয়েছেন বলে জানিয়েছেন।
তবে ফায়ার সার্ভিসের ঢাকা বিভাগের ঢাকা মেট্রোর উপ-পরিচালক দেবাশীষ বর্ধন জানান, চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিটি তদন্ত পূর্বক প্রতিবেদন দেবে। তারপরেই আগুন লাগার প্রকৃত কারণ সম্পর্কে জানা যাবে।

print

Leave a Reply