শিউলির কান্না

হাসনা হেনা রানু: বোটা সিংহ দীর্ঘ দিন পর বাংলাদেশে আসছেন। তার জন্ম সৌদির পাশের দেশ বাহারাইন । বোটার বাবা-মা সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত হয়েছেন। বাবা-মায়ের মৃত্যুর পর একা বোটা বিদেশে থাকতে চাইলেন না। বাংলাদেশে ফেরার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলেন। এ দেশে, বোটার দাদু রাজা ছিলেন । এখন ও দিদা – দাদু জীবিত আছেন।রাজ‍্যত্ব ও আছে।

——– এয়ার পোর্টে নেমে বোটা দাদুকে দেখতে পেলেন। দাদু-দিমা দুজনেই এসেছেন।আজ সবাই বিমর্ষ ভারাক্রান্ত!বোটার সঙ্গে দুটো ডেড বডি আছে। বোটার বাবা প্রতাপ সিংহ একেবারে দেশের শেকড় শুদ্ধ উপড়ে নিয়ে চলে যাননি বিদেশ বিভূঁইয়ে । তিনি উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডনে গিয়েছিলেন । সেখানে পরিচয় হয় ম‍্যানোলার সাথে। পরবর্তীতে ম‍্যানোলাকে বিয়ে করে স্ত্রীর দেশে সেটল্ হন।।ক’বছর পর স্ত্রী ম‍্যানোলার কোল আলো করে পুত্র সন্তান জন্ম নিল। প্রতাপ সিংহ পুত্রের নাম রাখেন বোটা সিংহ। বোটা বাবা-মার আদর্শে বড় হতে লাগলেন । বোটা উচ্চ শিক্ষা গ্রহণের জন্য লন্ডনে চলে গেলেন । এর মধ্যে বোটা জানতে পারেন ,এক মর্মান্তিক সড়ক দুর্ঘটনায় বাবা-মা দুজনই গত হয়েছেন। ডেড বডি হাসপাতালে শব ঘরে রাখা হয়েছে। বোটা দেশে ফিরে বাবা-মার লাশ বাংলাদেশে এনে দাহ করবেন। এটাই বোটার দাদু রুদ্র নীল সিংহের শেষ ইচ্ছে । বোটা দাদুর ইচ্ছে পূরণ করার জন্য ডেডবডি নিয়ে বাংলাদেশে এসেছেন। বাবা-মা দুজনকেই এক সঙ্গে হারিয়ে বোটা মানসিক ভাবে ভেঙ্গে পড়েন। তখন তিনি সিদ্ধান্ত নিলেন ওদেশের স্থাবর অস্থাবর সম্পত্তি বিক্রি করে, বাংলাদেশে সেটল্ হবেন।
—বোটার দেশে ফিরতে প্রায় দুই সপ্তাহ লেগে গেল।এটা স্বজন হারানো কাছের মানুষদের জন্য দীর্ঘ অগ্নি পরীক্ষা। রুদ্র নীল একটা অ‍্যাম্বুলেন্সে ডেড বডি দেশের বাড়ি নারায়ণগঞ্জ নিয়ে গেলেন। মিঃ সিংহ ছেলে-ছেলের বৌর মর্মান্তিক মৃত্যুতে প্রচন্ড ভাবে ভেঙ্গে পড়েন। গভীর শোক তিনি ধীরে ধীরে কাটিয়ে উঠতে লাগলেন নাতি বোটা সিংহকে কাছে পেয়ে। উনার বয়স হয়েছে। উনি বোটা সিংহের হাতে রাজ‍্যের সকল ভার তুলে দিলেন। বোটা ও দাদুর রাজ‍্যত্ব পেয়ে ভীষণ খুশি হলেন।
———– ছেলের শোকে বোটার দিদা মা জয়ন্তী বালা কঠিন ব‍্যাধিতে শয‍্যা নিলেন।দাদু রুদ্র নীল সিংহ ও ভেঙ্গে পড়েন।দিদা মা তখন একটা ইচ্ছা প্রকাশ করেন। তিনি নাত বৌ দেখবেন। প্রজাদের ডেকে বলেন,আস -পাশের গ্রামে সুন্দরী বালিকা আছে কার ঘরে খুঁজে বের কর। প্রজারা অনেক খোঁজাখুঁজি করে একটা মেয়ের সন্ধান দিলেন। শ্রীমতী রাণী ।বয়স কম। অপূর্ব নান্দনিক সুন্দরী।রাজা নাতির বিয়ের প্রস্তাব পাঠালেন। শ্রীর বাবা রঞ্জন রায় এ বিয়েতে সম্মতি প্রকাশ করেন। উভয় পক্ষের অনুমতি ক্রমে এক আড়ম্বরপূর্ণ পরিবেশে বিবাহ অনুষ্ঠান সম্পন্ন হল । শ্রীর বয়স দশ চলছে ,এটা বাল‍্য বিবাহ । তখন কার যুগে এমন রীতির চল ছিল।গরীব ঘরের সুন্দরী বালিকা মেয়ে । বিয়ে হয়েছে রাজ পরিবারে,ভাবা যায় ? রঞ্জন রায় ভীষণ খুশি। উনি কন‍্যাকে সাধ‍্যমত সাজিয়ে দিলেন।
———– বৌ এখন রাজ প্রাসাদে । দিদা মা নাত বৌ দেখে ভীষণ খুশি হলেন। শ্রীমতী এত ছোট্ট মেয়ে ,দিদি মা নাত বৌকে দেখে বলেন,দিভাই ভগবান তোকে চাঁদের মত মিষ্টি একটা মেয়ে দ‍্যান যেন। ঠিক তোর মত .! দিমার এ কথায় বোটা লজ্জা পেল। আর শ্রী ও ছোট্ট বালিকা বধূ ।ও দিমার কথার অর্থ কি করে বুঝবে ? মুখ নিচু করে বসে রইল।
——– বোটা শ্রীকে নিজের মত তৈরি করে নেয়ার চেষ্টা করেন। এমনিতেই শ্রী গায়ের , গরীব ঘরের মেয়ে। সে জীবনে রাজপরিবারের এত বিত্ত বৈভবের, বৈচিত্র্য কম দেখেছে ।
শ্রীর মনে হত, সে কোন রুপকথার গল্পের রাজ‍্যে আছে।
খুব সাদামাটা জীবনে অভ্যস্ত সে। কিছুদিনের মধ্যেই দাদু- দিমা আগ – পিছে পরলোকগমন করেন। এদিকে বোটার সাংসারিক জীবনে দশ বছর কেটে গেল। শ্রী এখন পরিপূর্ণ এক নারীতে পরিনত হয়েছে।তার ও এখন একটা সন্তান চায় । এতবড় রাজপ্রাসাদ কেমন শূন‍্য শূন্য লাগে।দিন যেতে থাকে অথচ শ্রীর মা হওয়ার কোন সম্ভাবনা দেখা যায় না।রাজা বোটা সিংহ সন্তান কামনায় মরিয়া হয়ে উঠলেন। তিনি স্ত্রীকে বড় বড় ডঃ কবিরাজ দেখালেন। কিন্তু সকলেই শ্রীর মা হওয়ার সম্ভাবনা ছেড়ে দিয়েছেন।
———– একদিন শেষ রাতে বোটা সিংহ স্বপ্ন দেখলেন ।তার স্ত্রী যদি পর পর সাত দিন ভোরবেলায় সূর্য দেবতাকে পূজা করেন তবেই তিনি মা হবেন। খুব ভোরে রাজার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি স্ত্রীকে কাছে ডেকে স্বপ্নের কথা জানালেন। এবং দিন তাং ঠিক করেন ,কত তাং থেকে তিনি রাণীকে সূর্য পূজা করতে বলবেন…।
————– আশ্বিনের প্রথম ভোরে রাণী সাজসজ্জায় ভূষিত হয়ে সূর্য দেবতা পূজা করতে শুরু করেন। শেষ পূজার দিন রাণী ছল ছল নয়নে রাজার দিকে তাকালেন, রাজা সুলভ চাহনিতে রাণীর মাথায় হাত রেখে শান্তনা দিয়ে বলেন, ভেব না রাণী আমার মন বলছে তোমার এই সূর্য দেবতা পূজা বৃথা যাবে না। তুমি জয়ী হবেই হবে।রাণী অশ্রু সিক্ত নয়নে পূজা শেষ করেন। এরপর অপেক্ষার পালা শুরু হল ।- ঐদিন থেকে রাণী কিছুই খেতে পারছেন না। সারাদিন বমি ভাব , তিনি কিছু বুঝে ওঠার আগেই রাজা বুঝতে পারেন রাণী মা হতে চলেছেন। রাণীর আদর যত্ন বেড়ে গেল।রাজা সন্তান কামনায় অস্থির হয়ে পড়লেন।
যথা সময়ে রাণী মা হলেন, একটা ফুটফুটে কন‍্যা সন্তানের।শিশু কন্যার মুখ দেখে রাজার সে কি আনন্দ উচ্ছ্বাস…! মূহুর্তে রাজা থমকে দাঁড়ালেন।আজ বাবা-মা,দাদু–দিমা সবাইকে খুব মনে পড়ছে।উনারা বেঁচে থাকলে এই দিনে কত খুশি হতেন।সেসব কথা ভেবে বোটা সিংহ ঝর ঝর করে কেঁদে উঠলেন। রাণী শিশু কন্যাকে নিয়ে রাজার কোলে তুলে দিয়ে বলেন, আপনি কাঁদছেন কেন? কন‍্যা সন্তান হওয়ায় কি খুশি হননি? মনে দুঃখ পেয়েছেন? পুত্র সন্তান হলে খুব খুশি হতেন? রাজা হুহু করে কেঁদে উঠে রাণীকে জড়িয়ে ধরে বলেন,না, রাণী …..
না…….!
আমি সে জন্য কাঁদছি না। আজ আমি আমার মাতা জীকে পেয়েছি…। আমার নয়ন মনি। আমার মা-মণি । আমি কাঁদছি আজ আমার আপন জন কেউই বেঁচে নেই ।সে দুঃখ বোধ থেকে।উনারা বেঁচে থাকলে কত খুশি হতেন।
——————-
———–রাণী রাজার দুঃখের মাঝেও ক্ষীণ কন্ঠে হাসলেন,সে তো সত্যি কথাই।তবে কে বলেছে আপনার আপন জন কেউ নেই ? ভাল করে তাকিয়ে দেখুন , আপনার মাতা জী আবার ফিরে এসেছেন। আমাদের কন‍্যার রুপে ।রাজা হেসে বলেন,হা রাণী । আমার কন‍্যা আমার আম্মি জী।ওকে পেয়ে আমার মন ভরে গেছে।
————-রাজা খুশিতে আত্মহারা হয়ে আসে পাশের কয়েক গ্রামের গরিব দুঃখী, অনাথদের মাঝে লক্ষ লক্ষ ধন সম্পদ বিলিয়ে দিলেন।
সবাই দু’হাত তুলে রাজ কুমারীর জন্য সৃষ্টিকর্তার দরবারে প্রার্থনা করলেন ।
———– এদিকে রাজ কুমারী ধীরে ধীরে বড় হতে থাকে।রাজা বোটা সিংহ কন‍্যার নাম রাখলেন , কঙ্কাবতী।
কঙ্কা এখন নিয়মিত স্কুলে যায়। কিন্তু একটা ব‍্যাপার , কঙ্কা যতই বড় হতে থাকে,ও কেমন যেন সূর্যের দিকে অদ্ভুত দৃষ্টিতে অপলক তাকিয়ে থাকে।
———- সূর্যকে ভীষণ ভাল লাগতে শুরু করে । কঙ্কা স্কুলে যায়, লেখা পড়া করে ।আর সারাক্ষণ কেমন সূর্যের ধ‍্যানে নিমগ্ন থাকে।
এভাবেই দিন কাটতে লাগলো।
কঙ্কা এস এস সি পরীক্ষা দিল। খুব ভাল রেজাল্ট করল । পাশাপাশি ও সূর্যকে ভালবেসে অনেক গভীরে চলে গেল।
———–সূর্যকে নিয়েই ওর ধ‍্যান , জ্ঞান । বিষয়টি রাজা এবং রাণীমাতা টের পেলেন।
——-কঙ্কা একদিন নিজের ঘরে দক্ষিণ জানালায় বসে সূর্যের সঙ্গে কথা বলে,
—– এই সূর্য আমি তোমাকে কত বার ডেকেছি ….!
তুমি কি কোন দিন ও আমার ডাকে সাড়া দেবে না?
আর কতবার ডাকবো তোমাকে ?
আমাকে আর কষ্ট দিওনা । প্লিজ …! একবার আমার ডাকে সাড়া দাও।
তুমি নিচেয় নেমে আস …..!

—— সূর্য কঙ্কার কথায় নিচেয় নেমে আসে না।
ওর কথা শুনে না । ওর ডাকে সাড়া দেই না।
———- সূর্য তো সূর্য‍্যই ..!
সে কারো কথা শুনে না ,
কারো কথা বোঝে না ।
কঙ্কা কেঁদে কেঁদে বুক ভাসায়।
এ দৃশ্য রাণী দেখে ফেলেন ।
রাণী মেয়েকে অনেক বোঝান , মামণি তুমি ভুল করেছ। সূর্য কখনো কারো সাথে কথা বলে না, কাউকে ভালবাসে না। সূর্যের প্রাণ নেই । তাহলে সে ভালবাসবে কেমন করে ? মামণি তুমি সূর্য কে ভুলে যাও ..,
——— কঙ্কা কেঁদে ওঠে ।কি আম্মি আমি সূর্যকে ভুলে যাব ? না, সেটা কখনোই সম্ভব নয়।
আমি সূর্যকে বিয়ে করব ,
তোমারা সূর্যের সাথে আমার বিয়ের আয়োজন কর । তখন দেখবে সূর্য আর অভিমান করতে পারবে না। আমার কাছে নেমে আসবে। কঙ্কা কাঁদতে থাকল ।রাণী মেয়েকে শান্তনা দিলেন ,দেখো মামণি যদি সেটা সম্ভব হয় , আমারা অবশ্যই তোমাকে সূর্যের সঙ্গে বিয়ে দেব। তুমি এ নিয়ে আর মন খারাপ করো না।
—— রাণী রাজাকে সব কথা খুলে বলেন। রাজার খুব ইচ্ছে ছিল মেয়েকে উচ্চ শিক্ষায় শিক্ষিত করবেন । কিন্তু মেয়ের এই পাগলামী দেখে তিনি প্রজাদের ডেকে মেয়ের বিয়ের জন‍্য সুপাত্র খুঁজতে বললেন। কঙ্কা এখন কলেজে পড়ছে ।
কিন্তু কারো সঙ্গে কথা বলে না।মেশে না। সারাক্ষণ মন মরা হয়ে কি যেন গভীর ভাবে ভাবতে থাকে। রাজা মনে করেন মেয়েকে এ ভাবতে আর চলতে দেয়া যায় না ‌। হয়তো একটি ভালো ছেলের সঙ্গে মেয়ের বিয়ে হলে সব কিছুই ঠিক হয়ে যাবে।

———-
কিছুদিনের মধ্যেই পাশের দেশে এক রাজকুমারের সন্ধান মিলল।
বোটা সিংহ পাত্র দেখে খুব খুশি হলেন।
——— পাত্র পক্ষ এসে কনে দেখে গেছে ।কনে তাদের খুব পছন্দ হয়েছে। কঙ্কা ফুলের মত একটা মেয়ে।ওকে দেখলে যে কারো পছন্দ হবে ——–

——— বিয়ের দিন ঠিক হল।এ বিয়ে বন্ধ করার জন্য কঙ্কা খুব কান্না কাটি করল । কিন্তু তাতে ও রাজার মন নরম হলো না।
কঙ্কা এক প্রকার নাওয়া খাওয়া সব কিছুই ছেড়ে দিল।
সূর্যের দিকে তাকিয়ে কি সব বিড়বিড় করে আর কাঁদে। মেয়ের বিয়ের আগের রাতে রাজা স্বপ্ন দেখলেন,কেউ তাকে বলছে বোটা সিংহ তুমি মেয়ের ভালবাসা মেনে নাও।নইলে বড় ধরনের অঘটন ঘটে যাবে ।
রাজার ঘুম ভেঙ্গে গেল। তিনি চমকে উঠলেন ।একি স্বপ্ন দেখলাম আমি?
————- কিন্তু কোন বাবা তার মেয়ের এমন ভালবাসা কখনো মেনে নিতে পারবে ? এ সম্ভব নয়। মেয়ের এমন সর্বনাশ আমি বাবা হয়ে দেখতে পারব না। আমার মেয়েকে আমি সুপাত্রের সঙ্গে বিয়ে দেব।
——— সে রাতে কঙ্কা কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়ে।
বিয়ের দিন খুব ভোরে ওর ঘুম ভেঙ্গে গেল।
ও চুপিচুপি পুকুর পাড়ে সূর্য ওঠার অপেক্ষা করতে লাগল । সূর্যকে নিয়ে ওর মনের মধ্যে একটা স্বপ্ন ছিল।
কিন্তু সূর্যের দিক থেকে কোন সাড়া মিলল না। কঙ্কা কেঁদে ওঠে বলে ———
ও প্রিয় ,

তুমি সূর্য….

ওরা হয়
সব তারা —
আকাশে উদয়
হলে তুমি ,
ম্লান হয় ওরা
তোমাকেই দিলেম ,
বিন্দু বিন্দু শিশির
(সবটুকু )ভালবাসা ..!!

———
—— সূর্য তুমি আমার ভালবাসার মানে বুঝলে না। কঙ্কা কাঁদতে কাঁদতেই রুমে এসে ওড়না গলায় পেঁচিয়ে সিলিং ফ‍্যানে ফাঁস লাগিয়ে আত্মহত্যা করে।
মাত্র আধা ঘন্টার মধ্যে সব শেষ হয়ে গেল।
এদিকে রাজ বাড়িতে বিয়ের আয়োজন শুরু হয়েছে।
প্রথমে রাণী টের পেলেন কঙ্কা আত্মহত্যা করেছে।
বিয়ে বাড়িতে শোকের মাতম চলছে।
ওই দিন বিকেলে কঙ্কাকে দাহ করার জন্য নদীর পাড়ে আনা হয়েছে।বর পক্ষের লোকজন ও ছিল ।
———- কঙ্কাকে চিতায় উঠানো হল পোড়ানোর জন্য।
কঙ্কার দেহ দাহ করা হল । সবাই বুক ভরা ব‍্যথা নিয়ে রাজ প্রাসাদে ফিরে এলেন। রাজাকে শান্তনা দেয়ার জন্য আসে পাশের কয়েক গ্রামের মানুষ ভীড় করছে প্রাসাদে।তারাও শোকাহত হয়ে পড়েছে।
রাজা রাণী কন‍্যা বিয়োগে পাগলের মত হয়ে গেলেন।
কিন্তু রাতে একটি ব‍্যাপার ঘটেছে । কঙ্কার মৃত দেহ যেখানে দাহ করা হয়েছে ঠিক সেখানেই গত রাতে একটি ছোট্ট চারা গাছ অঙ্কুরিত হয়েছে।
গাছটা বড় হতে থাকে।
তিন মাসে গাছটা বড় একটা পরিপূর্ণ বৃক্ষে পরিণত হয়েছে।
——–
আশ্বিনের প্রথম রাতে বৃক্ষে ছোট ছোট ফুল ফোঁটে । খুব ভরে সব ফুল ঝরে পড়ে গেল।
সবাই অবাক ফুল গুলো দেখে। এরপর থেকে প্রতি রাতেই গাছটাতে সাদা সাদা ছোট ছোট ফুল ফোঁটে।ভোরে সে ফুল ঝরে পড়ে মাটিতে।

দিনের বেলায় গাছের ফুল গুলো
কখনো সূর্যের আলো দেখে না। অভিমান করে ঝরে ঝরে পড়ে।
—– রাজা এ রহস্য বুঝতে পারলেন ,তার মেয়ে মৃত্যুর পর ফুলের গাছ হয়ে বেঁচে আছে।
—– —-
—–রাজা বোটা সিংহ অনেক ভেবে চিন্তে এই ফুলের নাম রাখলেন,
——-” শিউলি ফুল “…..

রাজা রাণী আশ্বিনের প্রতি ভোরে শিউলি ফুলের গাছ তলায় আসেন।গাছ তলায় পড়ে থাকা ফুলগুলো এক জায়গায় জড়ো করে হাতে নিয়ে নাড়াচাড়া করেন।

——– রাজা রাণীর দু’চোখ বেয়ে টুপটাপ করে রক্ত অশ্রু ঝরে পড়ে মাটিতে শিউলি ফুলের বুকে।
—— এভাবেই রাজা রাণীর চোখের জল আর শিউলি ফুলের কান্না মিশে একাকার হয়ে গেছে।
———
সেই থেকে শিশিরের জন্ম …..
শিশির সিক্ত ভেজা শিউলি ফুল গুলো পড়ে আছে গাছের তলায় মাটিতে …….
প্রতি আশ্বিনের গভীর রাতে
এক পৃথিবী কষ্ট নীড়ে শিউলি ফুল ফোটে …
ভোরে সূর্যোদয়ের আগে ও ঝুর ঝুর করে ঝরে পড়ে যায় মাটিতে ——
শিউলির কান্না কেউ শোনে না —–
আমরা যাকে শিশির বলি ,
শিশির শিউলির কান্না।

লেখিকা: হাসনাহেনা রানু, ঔপন্যাসিক ও কবি, খুলনা ।

print

Leave a Reply