বাংলাদেশে রঙ-বর্ণহীন পয়লা বৈশাখ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: এসো হে বৈশাখ, এসো, এসো/ তাপসনিশ্বাসবায়ে মুমূর্ষুরে দাও উড়ায়ে/ বৎসরের আবর্জনা দূর হয়ে যাক/ যাক পুরাতন স্মৃতি, যাক ভুলে-যাওয়া গীতি/ অশ্রুবাষ্প সুদূরে মিলাক।’ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর বাংলা নববর্ষকে আবাহন জানিয়েছিলেন এভাবেই। কিন্তু বাঙালির জীবনে গত বছরের মতো এবারও বাংলাদেশে এসেছে অন্যরকম বৈশাখ। এ বৈশাখ রঙ-বর্ণহীন, উৎসবহীন-মলিন। বাংলাদেশে চারদিকে বাজছে মৃত্যুর বাজনা, হারিয়ে যাচ্ছে অনেক প্রিয় মুখ। করোনা মহামারি বিশ্ববাসীর মতো বাংলাদেশেও বাঙালির জীবন করেছে তছনছ। তবুও বুধবার আরো একবার পুরনো বছরের জরা-জীর্ণকে পেছনে ফেলে নতুন করে এগিয়ে যাওয়ার সংকল্প নিয়েছে বাঙালি।
করোনা মহামারির কারণে বৈশ্বিক এই দুর্যোগের সময় বাংলাদেশের মানুষ অবরুদ্ধ হয়ে ঘরে বসে পহেলা বৈশাখ উদযাপন করতে বাধ্য হয়েছে। প্রাণে প্রাণ মিলেছে রাস্তা বা খোলা ময়দানে নয়, যার যার বাসায় কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুক, টুইটার, ম্যাসেঞ্জারে।
তবে করোনাভাইরাসের কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি এবং লকডাউন বিবেচনা করে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার বাংলা নববর্ষ সীমিত পরিসরে প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে চারুকলা অনুষদের শিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন মুখোশ ও প্রতীক নিয়ে অনুষদ প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্ষিপ্তভাবে প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান প্রতীকী এই শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।
পহেলা বৈশাখ উপলক্ষ্যে রাষ্ট্রপতি মো. আবদুল হামিদ ও প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা বাণী দিয়েছেন।
করোনা সংক্রমণে বর্তমান বিশ্ব বিপর্যস্ত। সে কারণে গত বছরের মতো এ বছরও আমাদেরকে সীমিতভাবে সবাইকে জনসমাগম এড়িয়ে বাংলা নববর্ষ ডিজিটাল পদ্ধতিতে ঘরে বসে উদযাপনের আহ্বান জানান প্রধানমন্ত্রী। ১৪২৭-এর আনন্দ-বেদনা, হাসি-কান্নার হিসাব চুকিয়ে শুরু হবে নতুন এক পথচলা। জাতি-ধর্ম-বর্ণ-গোত্র নির্বিশেষে সর্বজনীন উৎসবে ঘরোয়া পরিবেশে মেতে ওঠা বাঙালি গাইবে ‘এসো হে বৈশাখ এসো এসো’।
সব জায়গায় আজ দোলা দেবে পহেলা বৈশাখ তবে সেটা অন্যভাবে। বৈশ্বিক দুর্যোগ করোনার কারণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার সরকারি নির্দেশনার কারণে এবারের বৈশাখে থাকছে না শারীরিক উপস্থিতির কোনো আনুষ্ঠানিকতা। ‘কোভিড-১৯’ সারা বিশ্বকে অস্থির করে তোলার কারণে শারীরিক উপস্থিতিতে রমনার বটমূলে থাকবে না ছায়ানটের বর্ষবরণ, চারুকলায় থাকবে না মঙ্গল শোভাযাত্রা।
স্বাস্থ্যবিধি মেনে সামাজিক দূরত্ব বজায় রাখার কারণে জনস্বাস্থ্য ও জনস্বার্থের কথা চিন্তা করে রমনার বটমূল, টিএসসি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারুকলা অনুষদ, শিল্পকলা একাডেমি, হাতিরঝিল, বাংলা একাডেমিসহ উৎসবের রঙিন আঙ্গিনাগুলো ঢাকা থাকবে স্বাস্থ্যবিধির চাদরে।
আর উদীচী, খেলাঘর, গ্রুপ থিয়েটার ফেডারেশন, ছায়ানটসহ সামাজিক ও সাংস্কৃতিক প্রতিষ্ঠান ও সংগঠনগুলোও গতবারের মতো এবারও উদযাপন থেকে নিজেদের বিরত রাখছে আনন্দ আর উদ্দীপনায়। সরকারি-বেসরকারি টেলিভিশন ও রেডিও চ্যানেলগুলো এ উপলক্ষ্যে প্রচার করছে বিশেষ অনুষ্ঠানমালা। সংবাদপত্রগুলো প্রকাশ করেছে ক্রোড়পত্র ও বিশেষ নিবন্ধ। বাংলা নববর্ষের প্রথম দিনে সব কারাগার, হাসপাতাল ও শিশু পরিবারে (এতিমখানা) উন্নতমানের ঐতিহ্যবাহী বাঙালি খাবারের ব্যবস্থা করা হবে।
ছায়ানট তাদের ইউটিউব চ্যানেলে স্বল্প পরিসরে বৈশাখ বরণ করবে। ছায়ানটের জনসংযোগ বিভাগ জানায়, প্রাথমিকভাবে আমাদের সিদ্ধান্ত ছিল দর্শকশূন্য অবস্থায় অথবা পরিস্থিতি আরও বেশি প্রতিকূল হলে পহেলা বৈশাখের ভোরের অনুষ্ঠান আগেই রেকর্ড করে নেওয়া। সে লক্ষ্যে সম্মেলক দলের নিয়মিত মহড়াও চলছিল। কিন্তু করোনা পরিস্থিতির ক্রমান্বয় অবনতি এবং সরকারের সতর্কতামূলক বাস্তবিক সিদ্ধান্তসমূহ আমাদের মনে শিল্পীদের স্বাস্থ্য ঝুঁকির আশঙ্কা গভীরতর করে তোলে। আমাদের বেশ কজন শিল্পী ও কর্মীও করোনা-আক্রান্ত। দেশবাসী ও শিল্পীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে নিরুপায় হয়ে ডিজিটালি বৈশাখ উদযাপন করবে তারা। রেকর্ড করা এক ঘণ্টার অনুষ্ঠানমালা পয়লা বৈশাখ সকাল ৭টায় বাংলাদেশ টেলিভিশন প্রচার করবে। একইসাথে ছায়ানটের ইউটিউব চ্যানেলেও (youtube.com/ ChhayanautDigitalPlatform) অনুষ্ঠানটি দেখা যাবে।
এদিকে পয়লা বৈশাখ সকাল ১১টায় মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ফেসবুক পেজে অনলাইনে সরাসরি ‘নববর্ষ বরণ ১৪২৮’ অনুষ্ঠানের আয়োজন করা হয়েছে। অনুষ্ঠানে স্বাগত বক্তৃতা করবেন মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের অন্যতম ট্রাস্টি সংসদ সদস্য আসাদুজ্জামান নূর। আলোচক থাকবেন লেখক, সাংবাদিক আবুল মোমেন।
ভার্চুয়াল এই আয়োজনে সংগীত পরিবেশন করবেন বুলবুল ইসলাম, অদিতি মহসিন, শারমিন সাথী ইসলাম ময়না ও বিমান চন্দ্র বিশ্বাস। নৃত্য পরিবেশন করবে স্পন্দন, আবৃত্তি পরিবেশন করবেন ইকবাল খোরশেদ জাফর ও অনন্যা লাবনী পুতুল, বাউল গান পরিবেশন করবেন বাউল দেলোয়ার ও সোনিয়া। অনুষ্ঠানটি উপভোগ করা যাবে মুক্তিযুদ্ধ জাদুঘরের ফেসবুক পেজে https://www.facebook.com/ liberationwarmuseum.official. বঙ্গাব্দ ১৪২৮কে স্বাগত জানাতে ভার্চুয়াল অনুষ্ঠানের আয়োজন করেছে বাংলাদেশ সংগীত সংগঠন সমন্বয় পরিষদ। সংগঠনটির ফেসবুক পেজের এই অনলাইন আয়োজনে অংশ নেবেন- শিল্পী রফিকুল আলম, সুজিত মোস্তফা, বিশ্বজিৎ রায়, অনুপমা মুক্তি ও শাহনাজ বেলী।
এবার করোনার দ্বিতীয় ঢেউ ‘লকডাউনে’ ঘোষণায় ম্লান হলো নববর্ষ উৎসব। জেলা শিল্পকলা একাডেমির সাধারণ সম্পাদক অ্যাড. মাহমুদ হাসান বুলু জানান, বৈশাখের অনুষ্ঠান ঘিরে দেড়-দু’মাস আগে থেকেই প্রস্তুতি শুরু হয়। কিন্তু করোনার সেকেন্ড ওয়েব মোকাবিলায় সব আয়োজন ভেস্তে গেছে।
চাঁদেরহাট যশোরের সভাপতি ফারাজী আহমেদ সাঈদ বুলবুল জানান, করোনাভাইরাসের বিস্তার রোধে সরকারি বিধিনিষেধ মেনে গত বছরের মতো এবারো বাংলা বর্ষবরণ উৎসব আমরা করছি না। সুরবিতান সংগীত একাডেমি যশোরের সাধারণ সম্পাদক বাসুদেব বিশ্বাস জানান, খোলা ময়দানে এবারো নববর্ষের অনুষ্ঠান করব না; তবে অনলাইনে এ উৎসব আয়োজন করা হবে।
অপরদিকে, বিশ্ববিদ্যালয়ে এবার বাংলা নববর্ষ সীমিত পরিসরে প্রতীকী কর্মসূচির মাধ্যমে উদযাপিত হয়েছে। এ উপলক্ষে চারুকলা অনুষদের শিল্পীদের তৈরি বিভিন্ন মুখোশ ও প্রতীক নিয়ে অনুষদ প্রাঙ্গণে স্বাস্থ্যবিধি মেনে শারীরিক দূরত্ব বজায় রেখে সংক্ষিপ্তভাবে প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করা হয়। সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ ও ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান প্রতীকী এই শোভাযাত্রায় নেতৃত্ব দেন।
এতে আরও অংশগ্রহণ করেন, বিশ্ববিদ্যালয় উপ-উপাচার্য (শিক্ষা) অধ্যাপক ড. এ এস এম মাকসুদ কামাল, কোষাধ্যক্ষ অধ্যাপক মমতাজ উদ্দিন আহমেদ, চারুকলা অনুষদের ডিন অধ্যাপক নিসার হোসেন, ঢাবি শিক্ষক সমিতির সভাপতি অধ্যাপক ড. মো. রহমত উল্লাহ, সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক ড. নিজামুল হক ভূইয়াসহ চারুকলা অনুষদের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা।
এ উপলক্ষে উপাচার্য অধ্যাপক ড. মো. আখতারুজ্জামান- বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থী, কর্মকর্তা-কর্মচারীসহ সবাইকে বাংলা নববর্ষের আন্তরিক শুভেচ্ছা জানিয়ে বলেন, আবহমানকাল থেকে বাংলা নববর্ষকে বরণ করে নেয়ার যে বর্ণিল উৎসব ও ঐতিহ্য, সেটি অসাম্প্রদায়িক, উদার ও মানবিক মূল্যবোধসম্পন্ন। নানা বিবেচনায় বাংলা-১৪২৮ সালটি গুরুত্ববহ একটি বছর।ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শতবর্ষ, জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানের জন্মশতবর্ষ এবং স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তীর সন্ধিক্ষণে বাংলা নববর্ষের আগমন ঘটল।
কোভিড-১৯ এর কারণে উদ্ভূত পরিস্থিতি বিবেচনায় নিয়ে স্বাস্থ্যবিধি অনুসরণ করে অত্যন্ত সীমিত পরিসরে বাংলা নববর্ষকে স্বাগত জানাতে প্রতীকী মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করায় উপাচার্য চারুকলা অনুষদকে আন্তরিক ধন্যবাদ জানান।
সংস্কৃতি প্রতিমন্ত্রী কে এম খালিদ বলেন, বিশ্ব ঐতিহ্যের অন্তর্ভূক্ত মঙ্গল শোভাযাত্রা। কিন্তু চলমান করোনা মহামারি পরিস্থিতিতে এ বছর পহেলা বৈশাখ উৎসবমূখর পরিবেশে উদযাপন করা সম্ভব হচ্ছে না।আমরা আশা করি আগামীতে বাংলাদেশে আগের রূপে বাংলা নববর্ষ উদযাপন করতে সক্ষম হবো। নানা প্রতিবন্ধকতার মধ্যেও সংক্ষিপ্তভাবে প্রতীকী এই মঙ্গল শোভাযাত্রার আয়োজন করায় তিনি বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ ও চারুকলা অনুষদকে ধন্যবাদ জানান।

print

Leave a Reply