Warning: sprintf(): Too few arguments in /home/timesi/public_html/wp-content/themes/covernews/lib/breadcrumb-trail/inc/breadcrumbs.php on line 254

বাংলাদেশে বৃহস্পতিবার থেকে লকডাউন শিথিল


এনামুল হক, টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা : বিধিনিষেধ শিথিল করে ৮ দিনের জন্য গণপরিবহন চলাচলের সুযোগ করে দিয়েছে সরকার। তবে খুলে দেয়া হলেও করোনাভাইরাস সংক্রমণের এই পরিস্থিতিতে ‘আশার আলো’ দেখছেন না পরিবহন মালিক ও শ্রমিকরা। লকডাউন শিথিল ঘোষণার সাথে সাথেই যেন পাল্টে যেতে শুরু করে রাজধানীর চিত্র। চিরচেন রূপে ফিরতে শুরু করেছে ঢাকা। রাস্তায় দেখা দিয়েছে যানজট।
এদিকে বৃহস্পতিবার থেকে চলবে, বাস, ট্রেন, লঞ্চ এবং বিমান। খোলা হবে মার্কেট বিপনীবিতান। তবে মাত্র ৮ দিনের জন্য বাসা চালু এক ধরনের তামাশ বলে মনে করছেন পরিবহন সেক্টরের সাথে জড়িতরা। অপরদিকে সংক্রমনের এই অবস্থায় লকডাউন আরো কঠোর না করে শিথিল করাকে মানতে পারছেন না বিশে¬ষকরা।
শ্রমিকরা বলছেন, দীর্ঘদিন ধরেই ধাপে ধাপে বিধিনিষেধে প্রায় চলাচল বন্ধ রয়েছে গণপরিবহন। তাই অনেকটাই সংকটের মুখে সড়ক পরিবহনখাত। করোনাভাইরাস সংক্রমণ পরিস্থিতি ভয়াবহ আকার ধারণ করায় মানুষের মধ্যে আতঙ্ক রয়েছে। এছাড়া মানুষের অর্থনৈতিক অবস্থাও ভালো না। যাত্রী পরিবহন করতে হবে ধারণ ক্ষমতার অর্ধেক। এই অবস্থায় ঈদে মানুষ কতটা গ্রামমুখী হবে, সেটা নিয়ে সন্দেহ আছে পরিবহন মালিক ও শ্রমিকদের। তাই দূরপাল্লার গাড়ি চালিয়ে লাভের মুখ দেখা আদৌ সম্ভব হবে কি-না, সেটা নিয়ে ভাবছেন তারা।
পবিত্র ঈদুল আজহাকে সামনে রেখে গণপরিবহন চলাচল, দোকান-শপিংমল খুলে দেয়াসহ কঠোর স্বাস্থ্যবিধি মেনে সব কার্যক্রম পরিচালনার অনুমতি দিয়ে চলমান বিধিনিষেধ শিথিল করা হয়েছে। বৃহস্পতিবার মধ্যরাত থেকে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা পর্যন্ত বিধিনিষেধ শিথিল করে গত মঙ্গলবার মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ থেকে প্রজ্ঞাপন জারি করা হয়েছে। একইসঙ্গে ২৩ জুলাই সকাল ৬টা থেকে ৫ আগস্ট রাত ১২টা পর্যন্ত ফের কঠোর বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়েছে। আগামী ২১ জুলাই বুধবার দেশে মুসলমানদের দ্বিতীয় বড় ধর্মীয় উৎসব পবিত্র ঈদুল আজহা উদযাপিত হবে।
সায়েদাবাদে দূরপাল্লার বিভিন্ন বাসের টিকিট বিক্রি করেন মো. আলী হোসেন। তিনি বলেন, পরিবহন লাইনের সবার অবস্থা খুবই খারাপ। অনেক দিন পর গাড়ি চলবে, মালিক-শ্রমিকরাও প্রস্তুতি নিতেছেন। তিনি বলেন, এই খাতের মূল দুটি সিজন দুই ঈদ। কিন্তু সবকিছু মিলে মনে হচ্ছে না আহামরি কিছু হবে। কারণ পকেটে টাকা থাকলে বাড়ি যাওয়ার চিন্তা-ভাবনা থাকে মানুষের। সবারই অর্থনৈতিক অবস্থা খারাপ। ঈদ আসলেও পরিস্থিতি তো স্বাভাবিক না। আর মানুষের মনেও তো ভয় আছে করোনা নিয়ে। খুব জরুরি না হলে কেউ স্থান ত্যাগ করবে না। তাই আমগো ভাগ্যের উন্নতি হবে বলে তো মনে হয় না।
একটি বাসের চালক মো. আব্দুর রাজ্জাক বলেন, এভাবে গাড়ি বন্ধ থাকলে আমরা ক্যামনে চলমু। আমাগো চলার তো রাস্তা নাই। এতদিন বন্ধের পর এক সপ্তাহ টাইম দিছে, তাও দুই সিটে একজন। কী অইব বলেন? আমগো সারা মাস গাড়ি চালাইতে দেন, আমরা একজন কইরাই যাত্রী টানমু। এটাই আমগো দাবি। তিনি বলেন, আমগো আর কান্দাইয়েন না। আমরা দুই ছেলে, স্ত্রী আছে। বলতে গেলে এতদিন ভিক্ষা করে সংসার চালাইছি।
বাসের মালিক শরিফুল ইসলাম বলেন, একটা পরিস্থিতি স্বাভাবিক হইতেও তো কিছুটা সময় লাগে। এরমধ্যে মাত্র আটদিনের খোলা। আবার দুই সিটে যাবে একজন, কিন্তু দুই সিটের ভাড়া তো পাওয়া যাবে না। যতটা পারছি বসাইয়া বসাইয়া শ্রমিকদের বেতন দিচ্ছি। যা পরিস্থিতি তাতে খুলে দিলেও খরচ ওঠানো যাইব কিনা কে জানে। কুমিল¬া রুটে চলাচলকারী একটি গাড়ির চালক হোসেন মিয়া বলেন, ঈদের বাড়ি গেলেও ঈদের পরের দিনই আপনাকে আবার ছুটতে হবে। এরপর আবার ১৪ দিনের লকডাউন। মানুষ তো বেকায়দায় না পড়লে কোন জায়গায় যাবে না।
বাসের সুপারভাইজার মো. নবী হোসেন বলেন, গত বছর লকডাউনের সময় ১০ হাজার টাকা কিস্তি উঠাইয়া ঘর ভাড়া দিয়েছি। সেই কিস্তি এখনও শোধ করতে পারি নাই। এরমধ্যে কাজকাম বন্ধ। লকডাউনে আমগো মরা ছাড়া উপায় নেই। এখন খুলছে প্রতিদিন ৫০০/৭০০ টাকায় ইনকাম হইব। একদিন ইনকাম হইব দুইদিন খাইতে অইব। আটদিনে কী কদ্দুন কী অইব?
ঢাকা কেন্দুয়া রুটের একটি বাসের চালক মফিজুল ইসলাম রনির তিন মেয়ে, এক ছেলে। থাকেন নারায়ণগঞ্জের কাঁচপুর এলাকায়। বৃহস্পতিবার থেকে গাড়ি চালানোর প্রস্তুতি নিচ্ছেন। তিনি বলেন, লকডাউনের মধ্যে আমরা পুরাই বসা। এতদিন ঋণ করে কষ্ট করে চলেছি। গাড়ি খুলে দিয়েছে ভাল সিদ্ধান্ত। একদিন গাড়ি বন্ধ কোন সহযোগিতা পাই নাই আমি। সরকার বলছে সহযোগিতা করব, আমরা তো কিছুই পাইলাম না, কোন সংগঠন থেকেও কিছু পাইনি।


এদিকে তবে অল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালু করায় অসন্তুষ্টি প্রকাশ করেছেন তারা। মালিক-শ্রমিকদের অভিযোগ, করোনার অজুহাতে গত ১৫ মাসের মধ্যে মাত্র পাঁচ মাস গণপরিবহন চলছে। বাকি সময় লকডাউনে গণপরিবহন বন্ধ ছিল। এতে লাখো মালিক-শ্রমিকের আয় রোজগার বন্ধ রয়েছে। তারা সংসার চালাতে পারছে না। এখন মাত্র ৮ দিনের জন্য গণপরিবহন চালু করা তামাশা ছাড়া আর কিছুই নয়।
মহাখালী বাস টার্মিনাল থেকে দিনে চার শতাধিক বাস বগুড়া, নওগাঁ, রাজশাহী, চাপাইনবাবগঞ্জ, সিরাজগঞ্জ, রংপুর, দিনাজপুর, বৃহত্তর ময়মনসিংহ তথা নেত্রকোনা, শেরপুর, জামালপুর, টাঙ্গাইল জেলায় চলাচল করে। এছাড়া ওই টার্মিনাল থেকে বৃহত্তর ময়মনসিংহসহ সিলেটে আরো দেড় শতাধিক বাস যাত্রী পরিবহন করে।
বুধবার দুপুরে সরেজমিনে দেখা যায়, টার্মিনালের ভেতর তিন শতাধিক দূরপাল্লার বাস সারিবদ্ধভাবে পার্কিং করা রয়েছে। এরমধ্যে এক-তৃতীয়াংশ বাসে ধোঁয়া-মোছার কাজ করছেন চালক ও শ্রমিকেরা। ইঞ্জিন চালু দিয়ে পরীক্ষাও করছেন তারা।
সমান তালে চলছে নিজ নিজ পরিবহন টিকিট কাউন্টার পরিস্কারের কাজ। টার্মিনালের দ্বিতীয় তলায় সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির কার্যালয়ে আসা-যাওয়া করছেন বিভিন্ন পরিবহনে মালিকরা। টার্মিনালের ভেতর ফুটপাতে হরেক রকম পণ্যের পসরা সাজিয়ে বসছেন হকাররা। রিফাত পরিবহনের চালক সাব্বির হোসেন। বেলা ১১টার দিকে তিনি টার্মিনালে আসেন। বাস পরিস্কার করে ইঞ্জিন চালু দেন। আলাপকালে তিনি বলেন, এই অল্প সময়ের জন্য গণপরিবহন চালুর কোনো দরকার ছিল না। কারণ ঈদে ঘরমুখো মানুষের কারণে সব সড়কেই যানজট থাকে। চাইলেও বেশি যাত্রী নেওয়া সম্ভব না। তিনি বলেন, লকডাউনে কাজ বন্ধ থাকায় তাদের অনেক শ্রমিকের চার-পাঁচ মাসের ঘর ভাড়া বাকি। এখন কাল থেকে গণপরিবহন চালু হলে বকেয়া ভাড়ার জন্য চাপ দেবেন মালিকরা। মহাখালী আন্তঃজেলা সড়ক পরিবহন মালিক সমিতির সহ-সভাপতি শওকত আলী বাবুল বলেন, অনেক পরিবহন মালিক ব্যাংক থেকে মোটা অংকের সুদে টাকা নিয়ে বাস কিনেছেন। করোনার সময় বাস বন্ধ থাকলেও ব্যাংক সুদ নেয়া বন্ধ করেনি।
তিনি বলেন, শ্রমিকদের বেতন-ভাতাও কম-বেশি দিতে হচ্ছে। স্বাস্থ্যবিধি মেনে লকডাউনেও দূরপাল্লার বাস চলতে পারে। সরকার গণপরিবহন চালু রাখলে লাখ লাখ পরিবহন মালিক শ্রমিক বেঁচে যাবে। এনা পরিবহনের সহকারী ব্যবস্থাপক মো. মাঈন উদ্দিন। তিনি বলেন, লকডাউনের এ সময়ে তারা তাদের পরিবহনের সব শ্রমিকদের আর্থিক সহায়তা দিয়েছেন। এখন মাত্র আট দিনের জন্য বাস চালু করতে বলেছেন পরিবহন মালিক সমিতির মহাসচিব খন্দকার এনায়েত উল্লাহ।
এদিকে বৃহস্পতিবার থেকে বিভিন্ন রুটে ৩৮ জোড়া আন্তঃনগর এবং ১৯ জোড়া মেইল বা কমিউটার ট্রেন চলাচল করবে দেশের বিভিন্ন গন্তব্যে। এবার শুধু অনলাইনে ট্রেনের টিকিট পাওয়া যাবে। অন্যদিকে ট্রেন চলাচল স্বাভাবিক ও নির্বিঘ্ন করতে শুরু হয়েছে স্টেশন ও ট্রেন ধোঁয়া-মোছার কাজ। সবকিছু ঠিক থাকলে বৃহস্পতিবার ভোর সাড়ে ৪টা থেকেই যাত্রা শুরু করবে ট্রেন। কমলাপুর রেলওয়ে স্টেশন সূত্রে এসব তথ্য জানা গেছে।
এ বিষয়ে ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে ম্যানেজার মোহাম্মদ মাসুদ সারওয়ার বলেন, আমাদের যাত্রা নিরাপদ করতে প্রস্তুতি নেয়া শুরু হয়েছে। ইতোমধ্যে সব প্রস্তুতি শেষের দিকে, আমরা এখন ট্রেন ধোঁয়া-মোছার কাজ করছি। তিনি বলেন, আমরা মাস্ক ছাড়া কাউকে স্টেশনে এলাও করবো না। সকল যাত্রীদের অনুরোধ করবো আপনারা সবাই শারীরিক দূরুত্ব বজায় রাখবেন, মাস্ক পরে আসবেন।
ঢাকার কমলাপুর রেলওয়ে ম্যানেজার আরো বলেন, স্টেশনে না এসে আপনারা অনলাইনে টিকিট কাটুন, দেশের কোনো স্টেশনের কাউন্টারে সরাসরি টিকিট মিলছে না। তবে টিকিট আছে, পর্যাপ্ত আছে আপনারা অনলাইনে চেষ্টা করুন।

print

Leave a Reply