Warning: sprintf(): Too few arguments in /home/timesi/public_html/wp-content/themes/covernews/lib/breadcrumb-trail/inc/breadcrumbs.php on line 254

দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি

মৌলভীবাজার থেকে: এশিয়ার অন্যতম ও দেশের সবচেয়ে বড় হাওর হাকালুকি। দেশীয় দুর্লভ প্রজাতির জীববৈচিত্র্যের অভয়াশ্রম হিসেবে খ্যাতি রয়েছে এই হাওরের। অযত্ন আর অবহেলায় হাওরটির এখন বেহাল অবস্থা। সংশ্লিষ্টদের চরম উদাসীনতায় দীর্ঘদিন থেকে সংস্কার ও উন্নয়ন বঞ্চিত হওয়ায় এখন অস্তিত্ব সংকটে। হাওর হাকালুকি থেকে বছরান্তে সরকারের বড় অঙ্কের রাজস্ব আয় হলেও উন্নয়নে ব্যয় হচ্ছে না সিকি ভাগও। দু’একটি এনজিও হাকালুকির সার্বিক উন্নয়নে নামলেও এর নেপথ্যে বিনিয়োগ আর বড় অঙ্কের মুনাফা আয় ছাড়া নেই সন্তোষজনক দৃশ্যমান উন্নয়ন। এমন অভিযোগ হাওর পাড়ের বাসিন্দাদের। স্থানীয়রা হাকালুকির বয়ে চলা এমন দুরবস্থা লাঘবে নানা দাবিতে সোচ্চার হলেও টনক নড়ছে না সংশ্লিষ্টদের।
তাই এখান থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে অতিথি পাখিসহ নানা প্রজাতির জীববৈচিত্র্য। খাদ্য আর বাসস্থানের চরম সংকট-এর অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন বিশেজ্ঞরা। হিজল, করচ, বরুণ, আড়ং, মূর্তাসহ দিন দিন উজাড় হচ্ছে হাকালুকির জলজ ও বনজ পরিবেশ। নানা কারণে দেশীয় বিভিন্ন প্রজাতির মাছ, প্রাণি ও জলজ উদ্ভিদশূণ্য হচ্ছে। হাওর তীরের বাড়িগুলোতে (পাখি বাড়ি হিসেবে পরিচিত) পরিযায়ী ও দেশীয় প্রজাতির আশ্রিত পাখিগুলো রক্ষায় সরকারের সংশ্লিষ্ট বিভাগ নানা অজুহাতে সার্বিক অসহযোগিতা ও উদাসীনতা দেখাচ্ছে।

পরিসংখ্যান অনুযায়ী ১২১৩ প্রজাতির প্রাণি ও উদ্ভিদ ছিল হাকালুকি হাওরে। প্রতিদিনই প্রায় ৪ লক্ষাধিক মানুষের খাবার জোগান হতো ওখান থেকে। এখন ওল্টো চিত্র হাওরজুড়ে। দীর্ঘদিন থেকে শুমারি না হওয়ায় মিলছে না জীববৈচিত্র্যের সঠিক পরিসংখ্যানও। জেলেদের জালে মাছও ধরা পড়ছে কম। সেচ পানির অপ্রতুলতা কিংবা পর্যাপ্ততায় আশানুরূপ হচ্ছে না কৃষি আবাদ। এর কারণ হাকালুকির ছোট বড় ২৩৮টি বিলই এখন কম বেশি ভরাট। হাওরের সঙ্গে সংযুক্ত নদী, গাঙ ও ছড়ারও বেহাল দশা। মৌলভীবাজারের কুলাউড়া, জুড়ী ও বড়লেখা, সিলেটের ফেঞ্চুগঞ্জ ও গোলাপগঞ্জ উপজেলার ২৮ হাজার হেক্টর এলাকাজুড়ে হাকালুকি হাওর। হাকালুকির ওপর জীবন-জীবিকায় নির্ভরশীল হাওরপাড়ের কয়েক লাখ কৃষি ও মৎস্যজীবী মানুষ। কিন্তু হাওরের এই অবস্থায় তাদেরও দুর্দিন। বিলগুলোর নব্যতা হ্রাসে ঘনঘন বন্যা ও খরায় পাল্টে যাচ্ছে হাওরের দৃশ্যপট। শুষ্ক মৌসুমে পানি সংকটে যেমন কৃষি জমি আবাদ হচ্ছে কম, তেমনি হাওরজুড়ে গরু মহিষের বাতান কিংবা হাঁসের খামারের দেখাও মিলছে কম। হাওরের প্রাণ ফেরাতে দ্রুত প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নেয়ার জোর দাবি হাওর পাড়ের কয়েক লাখ উপকারভোগীদের। এশিয়ার বৃহত্তম মিঠা পানির জলাভূমি খ্যাত হাকালুকি হাওরে এ বছর গত কয়েক বছরের তুলনায় পাখি এসেছে কম। গত ২৩ ও ২৪শে ফেব্রুয়ারি দুই দিন হাকালুকি হাওরের ৪৩টি বিলে পাখিশুমারি শেষে সংশ্লিষ্টরা এ তথ্য দেন। আর এর আগে গতিবিধি পর্যবেক্ষণে হাওরে রিং পরানো ৩৩ প্রজাতির যে ৩৭০টি পাখির বার্ড রিংগিং (পাখির পায়ে রিং লাগানো) করা হয়েছিল এবার তার একটিরও সন্ধান মেলেনি। আন্তর্জাতিক প্রকৃতি সংরক্ষণ প্রতিষ্ঠান (আইইউসিএন), প্রকৃতি ও জীবন ফাউন্ডেশন (পিওজেএফ) এবং বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের (বিবিসি) সদস্যরা যৌথভাবে এ শুমারি চালায়। শুমারির নেতৃত্ব দেন পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। সঙ্গে ছিলেন বার্ড ক্লাবের সদস্য সারোয়ার আলম, অণু তারেক, সাকিব আহমদসহ অন্যরা। শুমারি শেষে তারা গণমাধ্যমকর্মীদের জানান ‘শুমারিকালে হাওরের ৪৩টি বিলে ৪৫ প্রজাতির ২৪ হাজার ৫৫১টি জলচর পাখি দেখা মিলেছে। এরমধ্যে ১৪ প্রজাতির হাঁস। গেল বছর শুমারিকালে হাওরে ৫৩ প্রজাতির ৪০ হাজার ১২৬টি জলচর পাখির দেখা পাওয়া গিয়েছিল। এরমধ্যে ছিল মহাবিপন্ন প্রজাতির পাখিও।

বাংলাদেশ বার্ড ক্লাবের তথ্যানুযায়ী ২০১৭ সালে হাকালুকিতে পাখির সংখ্যা ছিল ৫৮ হাজার ২৮১টি। ২০১৮ সালে তা কমে এসে দাঁড়ায় ৪৫ হাজার ১০০টি। ২০১৯ আরো কমে দাঁড়ায় ৩৭ হাজার ৯৩১টিতে। হাকালুকি হাওরে নির্ভরযোগ্য মৎস্য অভয়াশ্রম নেই বললেই চলে। নামমাত্র যেগুলো আছে সেই অভয়াশ্রমগুলোতেও শিকারিরা হানা দেয়। শীতকালে হাকালুকির বিলকে ঘিরে অতিথি পাখির বিচরণে মুখরিত হয়ে ওঠে পুরো হাওর। তখন শিকারিরাও ওত পেতে তা শিকার করে। হাকালুকি হাওরের ইকোসিস্টেম রক্ষায় অবিলম্বে হাওরকে উন্নয়ন প্রকল্পে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি উপকারভোগীদের। ১৯৯৯ সালে সরকার এ হাওরকে প্রতিবেশগত সংকটাপন্ন এলাকা (ইকোলজিক্যালি ক্রিটিক্যাল এরিয়া বাই সিএ) ঘোষণা করে। দেরিতে শুমারি হওয়া ছাড়াও নিরাপদ বাসস্থান ও খাদ্য সংকটের কারণে এ বছরও পাখির সংখ্যা কমছে বলে গণমাধ্যমকর্মীদের জানান পাখি বিশেষজ্ঞ ইনাম আল হক। এশিয়ান ওয়াটার বার্ড সেনসাস-এর অধীনে বাংলাদেশ বার্ড ক্লাব পাখি শুমারিতে একাধিকবার অংশ নেয়া বিশেজ্ঞরা বলেন, পরিযায়ী পাখিরা আসার পূর্বে তাদের আবাসস্থলটি নিরাপদ কি না সেটি বিবেচনায় রাখে। কিন্তু হাকালুকিতে চোরচক্র মাছ ও পাখিসহ অন্যান্য জলজ ও উদ্ভিদ সম্পদ নিধনে তৎপর। হাওর বাঁচাও, কৃষক বাঁচাও, কৃষি বাঁচাও কেন্দ্রীয় কমিটির সভাপতি বীর মুক্তিযোদ্ধা সিরাজ উদ্দিন আহমদ বাদশা বলেন, সরকার হাকালুকির সংস্কারে দ্রুত পদক্ষেপ না নিলে ধ্বংসের দোরগোড়ায় থাকা হাকালুকির ঐতিহ্য বিলীন হয়ে যাবে। হাওরটিকে উপলক্ষ্য করে জীবিকা নির্বাহকারী কয়েক লাখ মানুষ বেকার হবে।

print

Leave a Reply