আইন-আদালত

বোমা মেরে এলাকা ফাঁকা পিস্তল ঠেকিয়ে ডাকাতি

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট: স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ভয়ংকর এক চক্রের সন্ধান পাওয়া গেছে। ২০১০ সাল থেকে শুধু স্বর্ণের দোকানেই ডাকাতি করছেন তারা। দুর্ধর্ষ ও ধূর্ত এ চক্রটির প্রধান মো. হাসান জমাদ্দার (৪০)। তার বাড়ি বরিশালের বাকেরগঞ্জে। কিন্তু তিনি পাশের দেশ ভারতের আধার কার্ডধারী। ডাকাতি শেষে তিনি স্থলপথে সীমান্ত হয়ে অবৈধ উপায়ে ভারতে পালিয়ে যান। যে কোনো স্থানে ডাকাতির প্রস্তুতি হিসাবে নিজস্ব ফর্মুলায় তৈরি করেন বোমা। ঘটনাস্থলে আতঙ্ক ছড়াতে ওই বোমাগুলোর বিস্ফোরণ ঘটানো হয়। পরে পিস্তল ঠেকিয়ে, চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে লুট করা হয় দোকানের স্বর্ণালংকার এবং নগদ অর্থ। এভাবে সারা দেশে অন্তত ১৭টি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির ঘটনায় তাদের সংশ্লিষ্টতা পাওয়া গেছে। তবে এখনো তারা রয়ে গেছেন ধরাছোঁয়ার বাইরে।
এ চক্রের ডাকাতির পাঁচটি ফুটেজ এসেছে যুগান্তরের হাতে। এগুলো বিশ্লেষণ করে দেখা যায়, প্রতিটি ঘটনার আগে দুই থেকে তিনজন এসে স্থানটি রেকি করেন। তারা সামগ্রিক অবস্থা বিবেচনায় স্থানটিকে ডাকাতির উপযুক্ত মনে করলে অন্যদের মেসেজ দিয়ে আসতে বলেন। এরপর ক্রেতা সেজে এক থেকে দুজন স্বর্ণের দোকানে প্রবেশ করেন। প্রতিটি ঘটনাতেই ৬-৭ জন মাস্ক পরে ডাকাতির মিশনে আসেন। তাদের মধ্যে দোকানের ভেতরে থাকেন ৪-৫ জন। বাকিরা বাইরে পাহারা দেন। একজন দোকানের মালিকের দিকে পিস্তল তাক করে রাখেন। দোকানের ক্যাশের নগদ অর্থ নেওয়ার দায়িত্বে থাকেন একজন। অপর দুজন স্বর্ণালংকার হাত ব্যাগ, কাপড়ের শপিং ব্যাগ ও পাটের বস্তায় ঢুকিয়ে নেন। সাধারণত স্বর্ণের দোকানগুলো কাচ দিয়ে সাজানো থাকে। ফলে এগুলো খুলতে সময় না নিয়ে তারা চাপাতি দিয়ে গ্লাসগুলো ভেঙে ফেলেন। দেখা গেছে, তিনটি ঘটনায় দোকানের মালিককে শুরুতেই গুলি করে ও কুপিয়ে রক্তাক্ত করেছেন তারা। সবমিলিয়ে দেড় থেকে দুই মিনিটের মধ্যে ডাকাতি করে সটকে পড়েন।
এ ব্যাপারে কেরানীগঞ্জের নাসির উদ্দিন সুপার মার্কেটের নিউ আল আমিন জুয়েলার্সের মালিক বিপ্লব মন্ডল বলেন, এ ডাকাতরা অত্যন্ত ভয়ংকর। এ বছরের ১৭ আগস্ট দুপুর ২টার দিকে ২টি মোটরসাইকেলে চড়ে তারা ছয়জন এসেছিল। ৪ জন দোকানের ভেতরে ঢোকে। আতঙ্ক সৃষ্টি করতে ৫-৭টি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটায়। এরপর পিস্তল ও চাপাতির মুখে দোকানে থাকা ভাগিনা, কর্মচারী ও আমার ভাইকে জিম্মি করে সব লুটপাট করে দুই-তিন মিনিটের মধ্যে পালিয়ে যায়। এ ঘটনায় আমরা দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানায় মামলা করেছি। পুলিশের সঙ্গেও নিয়মিত যোগাযোগ রাখছি। কিন্তু পুলিশ কোনো আসামিকে এখনো গ্রেফতার করতে পারেনি।
অনুসন্ধানে জানা যায়, ২০১২ সালে এক ডাকাতির ঘটনায় চক্রের মূল হোতা হাসানের পায়ে গুলি করে চট্টগ্রাম মেট্রোপলিটন পুলিশ। এতে তার একটি পা বিকল হয়ে যায়। তারপর থেকে কৃত্রিম পা লাগিয়ে চলাফেরা করেন তিনি। ডাকাতিকালে হাসানরা যে বোমাগুলো ব্যবহার করেন, সেগুলোর বেশির ভাগই প্রস্তুত হয় পাবনা অঞ্চলে। ককটেলের মধ্যে আরও কিছু উপাদান মিশিয়ে বোমাটি শক্তিশালী করা হয়। সেগুলোর বিস্ফোরণ ঘটিয়ে ডাকাতি করে মোটরসাইকেলে চড়ে দ্রুত স্থান ত্যাগ করেন তারা। শুরুতেই এমন আতঙ্কের পরিবেশ তৈরি করেন, যাতে কেউ তাদের প্রতিহত করতে এগিয়ে আসতেও সাহস করে না। এভাবে কোটি কোটি টাকার স্বর্ণালংকার ও নগদ অর্থ লুট করে চক্রটি। পরে ব্রাহ্মণবাড়িয়ার কসবা সীমান্ত এবং মাঝেমধ্যে কুমিল্লা সীমান্ত হয়ে ভারতে চলে যান মূল হোতা হাসান। অবৈধভাবে পার্শ্ববর্তী দেশের আধার কার্ডও তৈরি করেছেন তিনি। এখন চেষ্টা করছেন পাসপোর্ট তৈরি করার। ভারতীয় অন্তত নয়টি নম্বরে তার নিয়মিত যোগাযোগের তথ্য পাওয়া গেছে। আর যোগাযোগের ক্ষেত্রে তিনি সাধারণত ভারতীয় ৯১৯৩৬২০২৫২৬৯ নম্বরটি ব্যবহার করে থাকেন।
এদিকে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর সূত্রগুলো বলছে, তারা এখন পর্যন্ত ১৪টি স্বর্ণের দোকানে ডাকাতির মামলায় হাসান জমাদ্দারের সম্পৃক্ততা পেয়েছে। তবে এ সংখ্যা আরও বাড়বে। যেগুলোয় সম্পৃক্ততা মিলেছে সেগুলো হলো-মানিকগঞ্জের সাটুরিয়ায় তিনটি, রাজধানীর রমনা ও বনানী থানায় দুটি, ঝালকাঠির নলছিটি থানায় একটি, মানিকগঞ্জ জেলায় আরও দুটি, ফেনী জেলায় দুটি, চট্টগ্রাম কোতোয়ালি থানা ও জোরারগঞ্জ থানায় দুটি এবং বগুড়া সদর থানায় একটি। এ চক্রটিই সর্বশেষ চলতি বছরে কেরানীগঞ্জের আব্দুল্লাহপুরে একটি জুয়েলার্সের মালিককে গুলি করে স্বর্ণালংকার লুট করেছে।
এ বিষয়ে দক্ষিণ কেরানীগঞ্জ থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. শাহ জামান বলেন, ডাকাতির মামলাটি গোয়েন্দা পুলিশ (ডিবি) তদন্ত করছে। আশা করছি, আসামিরা শিগগিরই ধরা পড়বে।
এদিকে হাসানের গ্রামের বাড়ি বাকেরগঞ্জের নিয়ামতি ইউনিয়নের রুপারজোর এলাকায় খোঁজ নিয়ে জানা যায়, তিনি এলাকায়ও নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন। এর আগে বাকেরগঞ্জে ৬০ ইয়াবাসহ পুলিশের হাতে ধরা পড়েন। এলাকার মানুষ জানেন, তিনি এখন ভারতে থাকেন। স্থানীয় ইউপি সদস্য শামীম সাজ্জাল এবং সংশ্লিষ্ট এলাকার গ্রামপুলিশ সদস্য দীনেশ কার্তিক জানান, ৫-৭ বছর ধরে তিনি এলাকায় নেই। তার বিরুদ্ধে থানায় অসংখ্য অভিযোগ আছে।

সূত্র: যুগান্তর।

Back to top button