শরতের কাশবন আর প্রকৃতির সাম্রাজ্যঃ দিয়াবাড়ি

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: এখন শরতকাল। আকাশে মেঘের ভেলা আর সাড়ি সাড়ি কাশবন যেন মিতালি করে এ ঋতুতে। আর এমন মনোরম পরিবেশ উপভোগ করতে চাইলে ঢাকাতেই তা সম্ভব। কিন্তু, সেটা কোথায়? হা, দিয়াবাড়ি । এটি ঢাকার উত্তরা ১৫ নম্বর সেক্টরে অবস্থিত। দিয়াবাড়ির আশ পাশের কাশবন ও লেকের সৌন্দর্য দেখার জন্য মুলত মানুষজন এখানে ভিড় করে। লেক, লেকের উপর ব্রিজ, চারপাশে ধূধূ কাশবন, লেকে নৌকাভ্রমন, ঘোড়ার পিঠে বসে দুলকি চালে কাশবন দর্শন আর চটপটি-ফুচকায় একটি বিকেল বেশ কাটিয়ে দেয়া যায় দিয়াবাড়ি এসে । উত্তরার দিয়াবাড়ির প্রাকৃতিক সৌন্দর্য আপনাকে নিয়ে যাবে শুভ্রতায় পরিপূর্ণ কোমল এক রাজ্যে। তাই উপভোগ করে আসুন ঋতুরাণী শরতের প্রধান আকর্ষণ কাশফুলের নরম ছোঁয়া। এখানে খুব কাছ থেকে বিমান উড্ডয়ন ও অবতরণ দেখা যায়। উত্তরা কিংবা গাজীপুর/টঙ্গিগামী কোন বাসে করে উত্তরা হাউস বিল্ডিং স্টপেজে নেমে মোড় থেকে বাম দিকে রিকশা নিয়ে দিয়াবাড়ি লেক চলে আসতে পারেন। মিরপুর বাসীরা বেড়িবাঁধ দিয়ে সহজেই চলে আসতে পারেন। দিয়াবাড়ি ঘাটে বিকেলের সুর্যাস্ত উপভোগ করার মজাই আলাদা। দিয়াবাড়ি, বট তলা, লেক ভিউ, উত্তরা, ঢাকা, ঢাকা শহরের ভিতরে একটি সুন্দর জায়গা। দিয়াবাড়ি “পার্কের ভিতর অসামাজিক কার্যকলাপ” সম্পূর্নরূপে নিষিদ্ধ।
শুটিং এর জন্য “দিয়াবাড়ি উত্তরা” খুবই জনপ্রিয়। এখানে অনেক বাংলা নাটকের গান , বাংলা ছবির গান ও বাংলা নাটক এর শুটিং হয়েছে। আবার অনেকে এখানে আসেন বাংলা নাটকের শুটিং দেখার জন্য।
শরতের গাঢ় নীলাকাশ। আর সাদা সাদা নরম মেঘের ফাঁক গলে বেড়িয়ে আসা সোনা ঝরা রোদ। আর কাশবনে রৌদ্র ছায়ার লুকোচুরি খেলায় মেতে উঠে প্রকৃতি। পশ্চিমে হেলে পড়া সেই সূর্যের কিরণ যখন কাশফুলের উপর পড়ে তখন এই দুইয়ের মিথষ্ক্রিয়ায় অদ্ভুত এক আভা প্রকৃতিতে ছড়িয়ে পড়ে। যা মন্ত্রমুগ্ধ হয়ে উপভোগ করা ছাড়া আর কোন উপায় থাকেনা। যত দূরে চোখ যায় দৃষ্টিজুড়ে শুধু কাশবন আর কাশবন। বিস্তীর্ণ এলাকা যেন শুভ্রতার চাদরে মোড়া এক অপরুপ সৌন্দর্যের রাজ্য। এভাবেই বর্ণনা করা যায় রাজধানীর অদূরে উত্তরা দিয়াবাড়ির এই মোহনীয় সৌন্দর্য। ইট কাঠ, কংক্রিটের এই কর্মব্যস্ত শহরে একটু প্রশান্তি ভরে দম নেয়ার স্থান তেমন নেই বললেই চলে। এক টুকরো সবুজের দেখা মেলাই যেখানে ভার, সেখানে সবুজের প্রান্তরে হারিয়ে যাওয়া অনেকটাই অসম্ভব। উত্তরা দিয়াবাড়িতে এলে সেই অসম্ভবকে সত্যি বলে মনে হবে। দিয়াবাড়ির আরেকটি অন্যতম দর্শণীয় জায়গা হচ্ছে বিশাল বটগাছ। আজকাল নাটকে এই বটগাছটি প্রায়ই দেখতে পাওয়া যায়। এক বিশাল বটগাছ আর তার দুপাশে রাস্তা। এই বটগাছেরও দেখা মিলবে দিয়াবাড়িতে। এই জায়গারটার নাম এখন হয়ে গেছে ‘দিয়াবাড়ি বটতলা’। প্রায় সময় সেখানে কোন না কোন নাটকের শুটিং চলে। ভাগ্য ভাল থাকলে হয়তো দেখা হয়ে যেতে পারে আপনার প্রিয় কোন তারকার সাথে। বেশ কিছুদূর সামনে গেলে দেখা পাওয়া যায় একটি মরা নদী। এটি তুরাগ নদীরই একটি শাখা। সেখানে নির্মাণ করা হয়েছে একটি নান্দনিক সংযোগ সেতু। এপাড়ে উত্তরার নতুন প্রজেক্ট অন্যদিকে মিরপুর। এই সেতুর উপর দাড়ালে আঁকা-বাঁকা নদীর নজরকাড়া সৌন্দর্য উপভোগ করা যায়। পরিত্যক্ত নৌকা। জাল ফেলে মাছ ধরছে জেলেরা। অদ্ভুত, অসাধারণ, রোমাঞ্চকর ও মনোরম পরিবেশে প্রিয়জনকে নিয়ে কাটিয়ে আসার জন্য দারুন এক বিকেল হয় এখানে ।ভ্রমনপিপাসুদের জন্য এখানে রয়েছে পাড়বাঁধানো লেক যা দিয়াবাড়ির সৌন্দর্য বাড়িয়ে দিয়েছে বহুগুনে। ভ্রমন আরো উপভোগ্য করতে দর্শনার্থীদের জন্য রয়েছে লেকের এদিক ওদিক থেকে নৌকায় করে ঘুরে আসার সুব্যবস্থা। চারদিকে শুনশান নীরবতা। একটু পর পর সেই নীরবতা ভেঙ্গে সাঁই সাঁই করে উড়ে যায় উড়োজাহাজ! অদ্ভুত সুন্দর একটি দৃশ্য। খুব কাছ থেকে উড়োজাহাজ উড়া দেখতে চাইলে এর চেয়ে ভাল কোন জায়গা হবে না। মাথা উঁচু করে উড়ে যাওয়া উড়োজাহাজ দেখা মনে করিয়ে দিবে হারিয়ে যাওয়া ছেলেবেলাকে। সে এক অসাধারণ অনূভুতি।পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসা এক দম্পতির সাথে কথা বললে তিনি জানান, পরিবার নিয়ে ঘুরতে আসার জন্য এর চেয়ে ভালো জায়গা আর হয়না। এখানে প্রাকৃতিক সৌন্দর্য থেকে শুরু করে বাচ্চাদের বিনোদনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাচ্চাদের জন্য রয়েছে নাগরদোলা, দোলনাসহ আরো বিভিন্ন খেলাধুলার অনুষঙ্গ। মোট কথা দিয়াবাড়িতে এলে প্রকৃতির সাথে হারিয়ে যায় সবাই । এখানে বোটে চড়তে ঘন্টাপ্রতি ২০০ থেকে ৪০০ টাকা করে নেয়া হয়। এছাড়া লেকের ধারে বসে এর সৌন্দর্য উপভোগের জন্য প্লাস্টিক ও বেতের চেয়ারের ব্যবস্থা রয়েছে। ভ্রমনকারীদের জন্য ভ্রাম্যমান খাবারের দোকানও রয়েছে । এখানে প্রতিদিন হাজারের উপর দর্শণার্থীদের সমাবেশ ঘটে তবে নৌকার স্বল্পতার অনেককেই দীর্ঘক্ষণ অপেক্ষা করতে হয়। দিয়াবাড়িতে নিয়মিত ঘুরতে আসা ১০-১২ জনের একদল দর্শনার্থীদের সাথে দেখা মিলল। তাদের একজন সৈকত আহমেদ জানান, রাজধানীতে উৎসবের অবকাশে প্রাণখুলে ঘুড়ে-বেড়ানোর মত জায়গা তেমন নেই। আমাদের মধ্যে সবাই চাকুরিজীবী। কেউ ব্যাংকে চাকুরিরত কেউ ব্যবসায়ী। তাই কাজের ব্যস্ততায় দূরে কোথায় ঘুরতে যাওয়ার মত সময় পাওয়া যায়না তাই বাড়ির কাছের এই অপরুপ সৌন্দর্য উপভোগ করার সুযোগ হাতছাড়া করিনা। তবে তিনি জানান এখানে আসতে পরিবহন ব্যবস্থার একটু সমস্যা রয়েছে। দিয়াবাড়িতে আসার জন্য পরিবহন চালকরা অতিরিক্ত ভাড়া নিচ্ছেন। এছাড়া সন্ধায় নিজ গন্তব্যে ফিরে আসার সময় পর্যাপ্ত গাড়ির সংকট দেখা যায়। এই অসংগতিটুকু বাদ দিলে আমরা মনমুগ্ধকর অনুভূতি নিয়েই বাড়ি ফিরি। ঢাকার এই দর্শণীয় স্থানটির নিরাপত্তা বিধানে টহলরত অবস্থায় দেখতে পাওয়া গেল কয়েকজন পুলিশ সদস্যকে। এ ছাড়া পুলিশের টহল গাড়িও নিয়মিত আইন শৃঙ্খলা রক্ষা ও নিরাপত্তার জন্য সুষ্ঠুভাবে কাজ করে যাচ্ছে। জানা যায়, এজন্য রাত পর্যন্ত পালাক্রমে টহল দেয় তারা। তারপরও এই বিশাল জায়গার নিরাপত্তা বিধানের পরও কিছু কিছু অপ্রিতীকর ঘটনা ঘটে যায়। তবে দর্শনার্থীদের জন্য আমাদের পরামর্শ হচ্ছে সন্ধ্যার পরে যাতে কোন দর্শনার্থী এখানে না থাকে।
যেভাবে যাবেনঃ দেশের যেকোন প্রান্ত থেকে উত্তরা রুটের যেকোন বাসে চড়ে হাউজবিল্ডিং বাস স্ট্যান্ডে নামতে হবে। সেখানে নর্থটাওয়ার ও মাসকট প্লাজার সামনেই দেখতে পাবেন দিয়াবাড়ি যাওয়ার জন্য অপেক্ষমান রিক্শা। রিক্শায় না চড়তে চাইলে উঠে পড়তে পারেন লেগুনায়। লেগুনা আপনাকে নামিয়ে দেবে সরাসরি দিয়াবাড়ি বটতলায়। লেগুনার ভাড়া জনপ্রতি ৩০ টাকা । আর সেখানে রিক্সা ভাড়া মৌসুম ভেদে ৮০ থেকে ১০০ টাকা।

print

Leave a Reply