বাংলাদেশে অসময়ে আগ্রাসী নদী ভাঙন

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: উজানের পাহাড়ি ঢল ও ভারি বর্ষণে নদীর জল বৃদ্ধি ও নদী ভাঙনে একের পর এক বাড়ি বিলীন হয়ে যাচ্ছে। অসময়ে ভাঙছে নদীর তীরে থাকা শত শত ঘরবাড়ি ও ফসলি জমি বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

ভাঙন রোধে স্থানীয়রা চাঁদা তুলে নদীতে বাঁশের ছটকা নির্মাণ করেছে। তারপরেও নদী ভাঙ্গন রোধ করা যাচ্ছে না। নদীতে সাজানো সংসার আর ঘর-গৃহস্থালিসহ ফসলি জমিন হারিয়ে আজ বহু মানুষ নিঃস্ব হয়েছেন। যমুনা, পদ্মা, মেঘনা ও ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে হারানো সেইসব ঘর ও ফসলি জমিন খুঁজে ফেরা ক্লান্ত চোখ বারবার ফিরে যায় অশ্রুসিক্ত হয়ে।

জানা গেছে, মুন্সীগঞ্জের টঙ্গীবাড়ি উপজেলার দিঘীরপাড় এর উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া আগ্রসী পদ্মায় আবারো অসময়ে ভাঙন দেখা দিয়েছে। এতে রাতের আধারে বিলীন হচ্ছে ফসলি জমি, বসত বাড়ি, রাস্তাঘাট ও মসজিদ মাদ্রাসা। কোন ভাবেই যেন ভাঙন থামছে না।

উপজেলা প্রশাসনের সহযোগিতায় ভাঙন রোধে ফেলা হয়েছিল জিও ব্যাগ। এখন সে ব্যাগও গিলে খাচ্ছে রাক্ষুসী পদ্মা। মুলচর, শরিষা বন, হাইয়ারপাড়, কান্দারবাড়ি এলাকা নদীতে বিলীন হয়ে যাচ্ছে।

এতে শতশত পরিবার দিশেহাড়া হয়ে পড়েছে। স্থানীয় মানুষের রাতে ঘুম আসেনা। পরিবার নিয়ে আতঙ্কে দিন কাটাচ্ছেন। কখন আবারো পদ্মায় ঘরবাড়ি গিলে খায়। দিনদিন ভাঙন আরো বাড়ছে।

প্রতিদিনই ফসলি জমি পদ্মায় বিলীন হয়ে যাচ্ছে। কিছুদিন আগে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হালদার ভুতু প্রশাসনের পাশাপাশি তার নীজ অর্থায়নে নদী ভাঙন রোধে জিও ব্যাগ ফেলেছেন। তা আবার পদ্মায় গিলে খাচ্ছে।

এ বিষয়ে উপজেলা পরিষদের চেয়ারম্যান জগলুল হালদার ভুতু জানান, দীর্ঘ মেয়াদী বেড়িবাঁধ নির্মান না করলে ভাঙন রোধ করা যাবেনা। বর্ষাকালে ভাঙনরোধে জিও ব্যাগ ফেলা হয়েছে। কিন্তু সে ব্যাগ গুলোও আবারো বিলীন হয়ে যাচ্ছে। উপজেলা প্রশাসনের সাথে আলোচনা করে নদী ভাঙন রোধে ব্যবস্থা নেয়া হবে।

এ বিষয়ে উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা নাহিদা পারভীন জানান, ভাঙন এলাকায় সরকারের পক্ষ থেকে ইউনিয়ন পরিষদের মাধ্যমে ত্রাণ সামগ্রী বিতরণ করা হচ্ছে। নদী ভাঙন এলাকায় বেড়িবাঁধ নির্মাণের জন্য পানি উন্নয়ন বোর্ডে প্রস্তাব দেয়া আছে। প্রস্তাব পাশ হলে নদী ভাঙন রোধে বেড়িবাঁধ নির্মাণ করা হবে।

অপরদিকে, শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী ইউনিয়নের পাচিল এলাকায় গত তিন দিনে ২০টি ঘড়বাড়ি বিলীন হয়ে গেছে। ভাঙন কবলিত এলাকার মানুষগুলো সর্বস্ব হারিয়ে আশ্রয় নিয়েছে অন্যের বাড়ি ও বন্যা নিয়ন্ত্রণ বাঁধে। ভাঙনের মুখে রয়েছে আরো অর্ধশতাধিক ঘরবাড়ি, ফসলি জমি, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানসহ স্থাপনা। এ ছাড়া এনায়েতপুর-শাহজাদপুর আঞ্চলিক সড়কটিও ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে।

সিরাজগঞ্জের এনায়েতপুরের খাজা ইউনুস আলী মেডিকেল কলেজ থেকে শাহজাদপুর উপজেলার কৈজুরী পর্যন্ত সাড়ে ছয় কিলোমিটার নদী তীর সংরক্ষণ বাঁধ প্রকল্পটি গত ৮ জুন একনেকে অনুমোদন হয়েছে।

এজন্য প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়েছেন স্থানীয় জনপ্রতিনিধি ও ভাঙন কবলিত মানুষ। দীর্ঘ প্রতীক্ষার এই প্রকল্প অনুমোদনের ফলে ভাঙন কবলিত মানুষের মধ্যে বেঁচে থাকার নতুন করে আশা জাগিয়েছে। তারা দ্রুত সময়ের মধ্যে বাঁধটি নির্মাণের দাবি জানিয়েছে।

কৈজুরী ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান সাইফুল ইসলাম বলেন, কৈজুরী ইউনিয়নের হাট পাচিল গ্রামে গত তিন দিনে অন্তত ২০টি বাড়ি ছাড়াও ফসলি জমি নদীগর্ভে চলে গেছে।

ভাঙন থেকে রক্ষা পেতে ঘরবাড়ি ভেঙে অন্যত্র সরিয়ে নিচ্ছে অনেকে। ভাঙন রোধে সাড়ে ৬০০ কোটি টাকার প্রকল্প একনেকে অনুমোদন হওয়ায় তিনি প্রধানমন্ত্রীকে ধন্যবাদ জানিয়ে বলেন, বাঁধ নির্মাণে আমরা প্রধানমন্ত্রী বরাবর স্মারকলিপি দিয়েছি।

মানববন্ধন করে প্রধানমন্ত্রীর দৃষ্টি আকর্ষণ করেছি। প্রধানমন্ত্রী ভাঙনকবলিত মানুষের দুঃখ-দুর্দশার কথা চিন্তা করে প্রকল্পটি অনুমোদন দিয়েছেন। এতে এই অঞ্চলের মানুষের দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণ হবে।

সিরাজগঞ্জ পাউবোর নির্বাহী প্রকৌশলী শফিকুল ইসলাম বলেন, ভাঙন রোধে জরুরি ভিত্তিতে বালিভর্তি জিওব্যাগ ফেলার কাজ শুরু হয়েছে। ওই অঞ্চল যাতে আর না ভাঙে, সেদিকে লক্ষ্য রেখে পাউবো কাজ করছে। এরই মধ্যেই আমরা জরিপ কাজ শুরু করেছি। শুষ্ক মৌসুমের শুরুতেই স্থায়ী বাঁধ নির্মাণ কাজ শুরু হবে।

অপরদিকে যমুনায় ভিটেমাটি হারানো নিঃস্ব এক বিধবা নারী জাহানারা বেগম। চোখের সামনেই যমুনায় বিলীন হতে দেখেছেন সাজানো সংসার আর ঘর-গৃহস্থালি। জাহানারা জানেন, সেই সাজানো বসতি আর ফিরে পাবেন না তিনি।

তবু প্রতিদিন সকাল হলেই তিনি ছুটে যান যমুনার তীরে। যমুনার ভাঙনে হারানো সেই ঘর খুঁজে ফেরা ক্লান্ত চোখ বারবার ফিরে যায় অশ্রুসিক্ত হয়ে।

জাহানারার স্বামী মৃত্যুকালে রেখে গিয়েছিলেন তিনটি পাকা ঘর, পাঁচ বিঘা ফসলি জমি, তিন বিঘা আয়তনের মাছের ঘের ও বসতভিটা। এখন সেগুলো শুধুই স্মৃতি। সামান্য কিছু বসতভিটা এখনও আছে।

তবে তাও নদীগর্ভে বিলীন হওয়ার আশঙ্কায় রয়েছে। প্রতিদিন সকালে নদী পাড়ের সেই জমিটুকু দেখতে আসেন জাহানারা।

অপরদিকে কুড়িগ্রামে ব্রহ্মপুত্র নদের ভাঙনে গত দুই মাসে অর্ধশতাধিক বসতবাড়ি ভেঙে গেছে। গৃহহীন হয়ে পড়েছে অসংখ্য পরিবার। বিনষ্ট হয়েছে গাছপালা। হুমকিতে রয়েছে আবাদি জমিসহ ঐতিহ্যবাহী মোল্লারহাট বাজার। ভাঙন কবলিতরা পাচ্ছেন না মাথা গোঁজার ঠাঁই।

ভাঙন রোধে স্থায়ী ব্যবস্থা গ্রহণ না করায় যে কোনো মুহূর্তে বিলীন হয়ে যেতে পারে হাটটি। ব্রহ্মপুত্র নদ মোল্লারহাটের পূর্ব দিকের অংশে প্রায় এক কিলোমিটার জায়গাজুড়ে ভাঙছে। বর্তমানে মোল্লারহাটটি ভাঙনের মুখে।

বেগমগঞ্জ ইউনিয়ন পরিষদের (ইউপি) ৬ নম্বর ওয়ার্ডের সদস্য মহু বাদশা জানান, গত পাঁচ বছরে মানচিত্র থেকে হারিয়ে গেছে ৬ নম্বর ওয়ার্ড। এই ওয়ার্ডের মানুষ এখন ৪ ও ৭ নম্বর ওয়ার্ডে আশ্রয় নিয়েছে।

চলতি বছর নদী ভাঙনে গৃহহীন হয়েছে দুটি ওয়ার্ডের প্রায় সাত শতাধিক মানুষ। গত কয়েক মাসেই ভেঙে গেছে ৬০টির মতো বাড়ি। ভাঙনের মুখে রয়েছে বসতবাড়ি, গাছপালাসহ আবাদি জমি। গৃহহীন পরিবারগুলো কোথায় আশ্রয় নেবে, এই দুশ্চিন্তায় কাটছে তাদের দিনক্ষণ। কেউ কেউ জায়গা না পেয়ে নদীর তীরে ছাপড়া তুলে মানবেতর দিন কাটাচ্ছে।

কুড়িগ্রাম পানি উন্নয়ন বোর্ডের নির্বাহী প্রকৌশলী আরিফুল ইসলাম বলেন, শুকনো সময়েও মোল্লারহাটে নদী ভাঙন রয়েছে। এরই মধ্যে আমরা ভাঙন রোধে কিছু জিও ব্যাগ ডাম্পিংয়ের প্রস্তুতি নিয়েছি।

স্থায়ীভাবে এটা রোধ করার জন্য বাজেট চেয়ে আবেদন করেছি। খুব তাড়াতাড়ি অনুমোদন পেলে আমরা স্থায়ীভাবে কাজ শুরু করতে পারব এবং ভাঙন রোধ করা সম্ভব হবে।

এছাড়াও তীব্র ভাঙনে দিশেহারা লালমনিরহাটের তিস্তাপাড়ের মানুষ। গত কয়েক দিনে তিস্তার পেটে বিলীন একটি গ্রামের শতাধিক পরিবারের ঘরবাড়ি, ঈদগাঁ মাঠ ও ফসলি জমি। হুমকির মুখে রয়েছে বিদ্যালয়সহ আরো নানান স্থাপনা। চোখের সামনে ভেসে যাচ্ছে প্রিয় বসতভিটা ও আসবাবপত্র।

print

Leave a Reply