করোনা সংক্রমণ মৃত্যুর শীর্ষে ঢাকা


টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: বাংলাদেশের ঢাকায় করোনার সংক্রমণ ভয়াবহ রূপ নিয়েছে। ইতিমধ্যেই সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়েছে সব জায়গায়। ঢাকা দুই সিটি করপোরেশন এলাকার ৫১টি থানার মধ্যে মাত্র দুটি থানায় সংক্রমণের হার কিছুটা কম। বাকি ৪৯টি থানায় সংক্রমণের হার খুবই ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে। ঢাকায় গত এক মাসে মৃত্যু বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৭০ শতাংশে। গত শুক্রবার বাংলাদেশে সর্বোচ্চ ৭৭ জনের মৃত্যুর যে রেকর্ড হয়েছে, এর মধ্যে ৫১ জনই ঢাকায়। তবে ঢাকার মধ্যে করোনাভাইরাস সংক্রমণে সবচেয়ে ঝুঁকিপূর্ণ হয়ে উঠেছে রূপনগর ও আদাবর থানা এলাকায়। এই দুই থানা এলাকায় শনাক্তের হার যথাক্রমে ৪৬ ও ৪৪ শতাংশ।বাংলাদেশে উচ্চ ঝুঁকিপূর্ণ এলাকার মধ্যে ঢাকা এখন শীর্ষে। করোনার এমন পরিস্থিতি ঢাকার জন্য খুবই বিপজ্জনক বলছেন বিশেষজ্ঞরা।
এদিকে বাংলাদেশে করোনাভাইরাস পরিস্থিতির অবনতি হলে সরকার গত ৫ এপ্রিল থেকে ১১ এপ্রিল পর্যন্ত নানা নিষেধাজ্ঞা জারি করে। পরে এসব নিষেধাজ্ঞায় বেশ কিছু পরিবর্তন করা হয়। যার মধ্যে সিটি করপোরেশন এলাকায় সকাল-সন্ধ্যা অর্ধেক আসন ফাঁকা রেখে বাস চলাচল করছে। তবে সারা বাংলাদেশে যাত্রীবাহী বাস ও ট্রেন চলাচল বন্ধ রয়েছে।
এরই মধ্যে আগামী ১৪ এপ্রিল থেকে এক সপ্তাহের কঠোর বিধি-নিষেধ আসছে বলে জানিয়েছেন সড়কমন্ত্রী ওবায়দুল কাদের। এই বিধি-নিষেধের আওতায় গত বছরের মতো জরুরি সেবা ছাড়া সরকারি-বেসরকারি সব অফিস-আদালত, কলকারখানা, পরিবহন বন্ধ রাখার ঘোষণা আসছে।
এ ব্যাপারে সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, এখন দেশের মধ্যে ঢাকা সর্বোচ্চ সংক্রমিত। শনাক্তের হার বিবেচনায় সব জেলায় ১০ শতাংশের ওপরে চলে এসেছে, শুধু ঢাকায় সর্বোচ্চ সংক্রমণ। সবচেয়ে বেশি সংক্রমিত ও সবচেয়ে বেশি মৃত্যুর ঘটনা ঢাকায়। এখানে ঘনবসতি, এখানে ঝুঁকি বেশি, এখানে বাইরে থেকেও রোগী আসছে। সব মিলে এখানে ঝুঁকি বেশি।
বেশি সংক্রমিত ৩১ জেলার শীর্ষে ঢাকা : মার্চের শেষ দুই সপ্তাহে (১৭-৩০ মার্চ) দেশে করোনার সর্বোচ্চ সংক্রমিত জেলার সংখ্যা ছিল ১০টি। এসব জেলায় পরীক্ষা অনুপাতে রোগী শনাক্তের হার ছিল ৩১-৪০ শতাংশের কিছুটা বেশি। সেখানে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ মিলেছিল যে তিন জেলায়, তার মধ্যে ঢাকা ছিল ৩ নম্বরে। শীর্ষে ছিল মৌলভীবাজার ও মুন্সীগঞ্জ। অথচ এর এক সপ্তাহ পর (২৭ মার্চ-২ এপ্রিল) এই ৩১ জেলার মধ্যে সংক্রমণের শীর্ষে পৌঁছায় ঢাকা। এ সময় যে ১০ জেলায় সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ পায় আইইডিসিআর, সেখানে সবচেয়ে বেশি রোগী মেলে ঢাকায়।
বেশি সংক্রমণ উত্তর সিটিতে : আইইডিসিআর গত ২৭ মার্চ-২ এপ্রিল পর্যন্ত ঢাকা শহরের এক সপ্তাহের সংক্রমণের তথ্য জানিয়েছে। সে তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখা গেছে, এ সময় দক্ষিণ সিটি করপোরেশন এলাকায় ১৪ হাজার ৩৩২ জন মানুষের করোনা পরীক্ষায় শনাক্তের হার পাওয়া গেছে ৩৬ শতাংশ। অন্যদিকে, ঢাকা উত্তর সিটি করপোরেশনে নমুনা পরীক্ষা হয়েছে ৩৬ হাজার ৭৭১ জনের এবং পরীক্ষা অনুপাতে শনাক্তের হার পাওয়া গেছে ২৯ শতাংশ। সে হিসাবে কম পরীক্ষা করেও করোনা পজিটিভ বেশি পাওয়া গেছে দক্ষিণ সিটি করপোরেশনে। উত্তরের তুলনায় এখানে শনাক্ত হার ৭ শতাংশ বেশি।
সর্বোচ্চ সংক্রমিত ৩১ জেলাকেও ছাড়িয়ে দুই এলাকা : আইইডিসিআরের তথ্য অনুযায়ী, সারা দেশে ৩১ জেলায় এখন উচ্চঝুঁকিপূর্ণ সংক্রমণ। এসব জেলায় সংক্রমণ হার ৩১-৪০ শতাংশের কিছু বেশি। অথচ ঢাকার রূপনগর ও আদাবর থানায় সংক্রমণ হার সারা দেশের মধ্যে সবচেয়ে বেশি। এর মধ্যে রূপনগরে শনাক্তের হার ৪৬ ও আদাবরে ৪৪ শতাংশ।
বেশি সংক্রমণ ১৯ এলাকা : ঢাকার দুই সিটি করপোরেশনের ৫১ থানার মধ্যে ১৯টি থানায় এই মুহূর্তে সবচেয়ে বেশি সংক্রমণ পাওয়া গেছে। এসব এলাকায় শনাক্তের হার ৩১ শতাংশের বেশি। এলাকাগুলো হলো রূপনগর, আদাবর, শাহ আলী, রামপুরা, তুরাগ, মিরপুর, কলাবাগান, তেজগাঁও, মোহাম্মদপুর, মুগদা, গে-ারিয়া, ধানম-ি, হাজারীবাগ, নিউমার্কেট, চকবাজার, সবুজবাগ, মতিঝিল, দারুসসালাম ও খিলগাঁও।
২০ শতাংশের বেশি সংক্রমণ ২৩ এলাকা : মোট ৫১ থানার মধ্যে ২৩ থানায় শনাক্তের হার ২১-৩০ শতাংশের মধ্যে। এলাকাগুলো হলো শাহবাগ, বংশাল, লালবাগ, শাহজাহানপুর, রমনা, কামরাঙ্গীরচর, শ্যামপুর, বাড্ডা, বনানী, উত্তরখান, শেরেবাংলা নগর, সূত্রাপুর, যাত্রাবাড়ী, পল্লবী, কাফরুল, ডেমড়া, ওয়ারী, ভাটারা, দক্ষিণখান, খিলক্ষেত, কদমতলী, উত্তর-পূর্ব থানা ও পল্টন।
সংক্রমণের ৩ নম্বরে ৭ এলাকা : ঢাকা শহরের মধ্যে মাত্র ৭ এলাকায় সংক্রমণ কিছুটা কম ১১-২০ শতাংশের মধ্যে। এলাকাগুলো হলো তেজগাঁও ডেভেলপমেন্ট, উত্তর-পশ্চিম থানা, গুলশান, ক্যান্টনমেন্ট থানা, তেজগাঁও শিল্প থানা ও বিমানবন্দর থানা।
সবচেয়ে কম মাত্র দুই এলাকা : গত ২৭ মার্চ থেকে ২ এপ্রিল এই এক সপ্তাহে ঢাকার মধ্যে সবচেয়ে কম পরীক্ষা হয়েছে কোতোয়ালি ও সদরঘাট থানার অন্তর্ভুক্ত এলাকাগুলোয়। এই দুই থানায় পরীক্ষার সংখ্যা ১০-এর নিচে। ফলে এখানে শনাক্তও কম পেয়েছে আইইডিসিআর। তবে ঠিক কী পরিমাণ মানুষ এখানে আক্রান্ত হয়েছেন, সে তথ্য জানায়নি আইইডিসিআর।
মৃত্যুতেও শীর্ষে ঢাকা : এক মাসে দেশে করোনায় মারা গেছে মোট ১ হাজার ১৫৯ জন। এর মধ্যে ৮১৭ জনই ঢাকা বিভাগের। শতকরা হিসাবে যা মোট মৃত্যুর ৭০ শতাংশের বেশি। এই এক মাসে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ২৭ জন করে করোনা রোগী মারা গেছেন। তবে শেষ ১০ দিনে অর্থাৎ চলতি মাসের ১০ দিনে সেটা আরও অনেক বেড়েছে। এই ১০ দিনে ঢাকায় প্রতিদিন গড়ে ৪২ জনের বেশি করে রোগী মারা গেছেন। এ ছাড়া দেশে গত বছরের মার্চে প্রথম করোনা শনাক্তের পর এ পর্যন্ত ঢাকায় মোট মারা গেছেন ৫ হাজার ৫৭৫ জন, যা দেশে মোট মৃত্যুর ৫৭ দশমিক ৭১ শতাংশ। দেশে করোনায় মোট মৃত্যুর অর্ধেকের বেশি মারা গেছেন ঢাকা বিভাগে।
ঢাকায় জনস্বাস্থ্যকাঠামো নেই : সরকারের রোগতত্ত্ব, রোগ নিয়ন্ত্রণ ও গবেষণা প্রতিষ্ঠানের (আইইডিসিআর) উপদেষ্টা ও সাবেক প্রধান বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা ডা. মুশতাক হোসেন দেশ রূপান্তরকে বলেন, সংক্রমণ নিয়ন্ত্রণে ঢাকায় সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো এখানে জনস্বাস্থ্যকাঠামো নেই। বড় বড় সিটিতে নেই। সিটি করপোরেশনের মধ্যে চট্টগ্রামে জনস্বাস্থ্যকাঠামো ভালো। সেখানে প্রতিটি ওয়ার্ডে স্বাস্থ্যকাঠামো আছে, গ্রামে গ্রামেও আছে। স্বাস্থ্যকর্মী বাড়ি বাড়ি যান। ঢাকা শহরে এটা একদমই নেই। এনজিওদের দিয়ে মাতৃ ও শিশুস্বাস্থ্যের কিছু সেবা দেওয়া হয়। ঢাকায় মনে করা হয় বড় বড় হাসপাতাল আছে, আর কিছুর দরকার নেই। কিন্তু হাসপাতাল তো আর জনস্বাস্থ্যের কাজ করে না। রোগ হলে চিকিৎসা দেয়। আমাদের দরকার রোগের প্রাথমিক পরিচর্যা ও রোগ প্রতিরোধব্যবস্থা। কাজেই রোগ প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা না করলে রোগীর সংখ্যা তো বাড়তেই থাকবে।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের মুখপাত্র ও নন-কমিউনিকেবল ডিজিজের (এনসিডিসি) পরিচালক ঢাকার পরিস্থিতির খারাপের কারণ হিসেবে বলেন, ঢাকার অবস্থা খারাপ তো নতুন না, প্রথম থেকেই ছিল। ঢাকা ও নারায়ণগঞ্জে সংক্রমণ শুরু থেকেই বেশি। অল্প একটু জায়গার মধ্যে দুই কোটি মানুষ, এখানেই তো সংক্রমণ হবে। এখানে মানুষের চলাচল বেশি, ঢাকার বাইরে থেকে লোকজন আসে। দেশের মধ্যে ঢাকাকেন্দ্রিক জনসমাগম সবচেয়ে বেশি। যেখানে লোক বেশি, সেখানেই কভিড বেশি হবে।
ওয়ার্ডে ওয়ার্ডে আইসোলেশন সেন্টার খোলার পরামর্শ : ডা. মুশতাক হোসেন বলেন, ঢাকাকে রক্ষা করতে হলে এখানে সম্পদ বিনিয়োগ করতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে জনস্বাস্থ্যকাঠামো গড়ে তুলতে হবে। প্রত্যেক ওয়ার্ডে আইসোলেশন সেন্টার খুলতে হবে। কমিউনিটি সেন্টারগুলোতে সেন্টার খোলা যেতে পারে। টেস্টিং সেন্টার করতে হবে। এভাবে রোগী শনাক্ত করে চিকিৎসা দিলে এখানে সংক্রমণ কমে যাবে।
ঢাকার সিভিল সার্জন ডা. আবু হোসেন মো. মঈনুল আহসান বলেন, ঢাকায় সংক্রমণ বেশি। কারণ ঢাকার সঙ্গে সব জেলার যোগাযোগ বেশি। বিভিন্ন জেলা থেকে লোকজন ঢাকায় আসছেন। এটা সারা দেশের সেন্টার। এখানে লোকজন নিয়ন্ত্রণ করা যায় না। যদি নিয়ন্ত্রণ করা যেত, তাহলে করোনাও নিয়ন্ত্রণ হতো। চলাচল বন্ধ করা না গেলে নিয়ন্ত্রণ হবে না। লোকজনের যাতায়াত অনেক বেড়ে গেছে। এটা নিয়ন্ত্রণ করা না গেলে কখনোই করোনা নিয়ন্ত্রণ করা যাবে না। কঠোরভাবে বিধিনিষেধ আরোপ করতে হবে, প্রয়োজন ছাড়া কেউ বের হতে পারবেন না, বিয়ে অনুষ্ঠান বন্ধ করতে হবে। এসব সিদ্ধান্ত আমরা নিয়েছি। আগামীকাল (আজ) থেকে হয়তো পারিবারিক অনুষ্ঠান, ওয়াজ মাহফিল, সব বন্ধ হয়ে যাবে। অ্যামিউজমেন্ট পার্ক, বিয়েশাদির কমিউনিটি সেন্টারগুলো বন্ধ হয়ে যাবে।
অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ রোবেদ আমিন বলেন, পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে পর্যাপ্ত উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল এবং তখন নিয়ন্ত্রণেও এসেছিল। তবে স্বাস্থ্যবিধি কঠোরভাবে না মানলে সংক্রমণ যেকোনো সময় বাড়তে পারে। এটা মহামারীর নিয়ম। এর মধ্যেই নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করতে হবে। মানুষকে স্বাস্থ্যবিধি মানতে বাধ্য করতে হবে। সরকার যে সর্বাত্মক লকডাউনের কথা ভাবছে, সেটা যদি ঠিকমতো হয়, আশা করছি নিয়ন্ত্রণে চলে আসবে।
এই কর্মকর্তা বলেন, এক মাস আগেও পরিস্থিতি এতটা খারাপ ছিল না। সুতরাং বিদ্যমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে তাৎক্ষণিক উদ্যোগ নিতে হয়। এখন হাসপাতালে বেডের সংখ্যা বাড়ানো হচ্ছে। পরীক্ষাও বাড়ানো হয়েছে। আশা করছি পরিস্থিতির উন্নতি হবে। কিন্তু সংক্রমণ কমাতে হবে। এটা ছাড়া বাংলাদেশে আর কোনো উপায় নেই।

print

Leave a Reply