জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ড: সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ৮ জন ৪ দিনের রিমান্ডে


টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেডের জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে ৫২ জনের মৃত্যুর ঘটনায় দায়ের করা হত্যা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদে সজীব গ্রুপের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মো. আবুল হাসেমসহ ৮ আসামিকেই ৪ দিনের রিমান্ডে নিয়েছে পুলিশ। শনিবার তাদের আদালতে তুলে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা ১০ দিনের রিমান্ড চাইলে আদালত ৪ দিনের রিমান্ড মঞ্জুর করেন বলে জানিয়েছেন রাষ্ট্রপক্ষের আইনজীবী মাহবুবুর রহমান ইসমাইল।
তিনি জানান, শুনানি শেষে জ্যেষ্ঠ জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট ফাহমিদা খাতুন ৪ দিনের রিমান্ডের আদেশ দেন। এর আগে শনিবার দুপুরে মামলার পর ওই ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়। গ্রেফতারকৃতরা হলেন মোহাম্মদ আবুল হাসেম ও তার ৪ ছেলে হাসিব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহীম, তাওসীব ইব্রাহীম ও তানজীম ইব্রাহীমও রয়েছেন। অন্য তিনজন হলেন প্রতিষ্ঠানটির প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহান শাহ আজাদ, হাসেম ফুড লিমিটেডের ডিজিএম মামুনুর রশিদ ও এডমিন প্রধান সালাউদ্দিন।
জানা গেছে, রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড লিমিটেডের জুস কারখানায় অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় মামলার বাদী হয়েছেন রূপগঞ্জ থানাধীন ভুলতা ফাঁড়ির ইনচার্জ পুলিশ পরিদর্শক (ইন্সপেক্টর) নাজির উদ্দিন মজুমদার। মামলায় অজ্ঞাত আসামি করা হয়েছে আরো ১৫/২০ জনকে। মামলা হওয়ার সাথে সাথে পুলিশ অভিযান চালিয়ে সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যান মোহাম্মদ আবুল হাসেম, তার ছেলে হাসিব বিন হাসেম, তারেক ইব্রাহিম, তাওসীব ইব্রাহিম, তানজিব ইব্রাহিম, প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা শাহেন শাহ আজাদ, উপমহাব্যবস্থাপক মামুনুর রশিদ ও প্রশাসনিক কর্মকর্তা মো. সালাহউদ্দিনকে গ্রেফতার করে।
এদিকে ৫২ জন শ্রমিকের মর্মান্তিক মৃত্যুর ঘটনায় দেশের রাষ্ট্রপতি ও প্রধানমন্ত্রী শোক প্রকাশ করলেও একটিবারের জন্যও আসেননি সজীব গ্রুপের মালিক এমএ হাসেম। রূপগঞ্জের কর্ণগোপ এলাকার হাসেম ফুড লিমিটেডের ছয়তলা ভবনে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডের দুদিন পার হলেও তার দেখা বা বক্তব্য পাননি গণমাধ্যমকর্মীরা।
পুলিশের ঢাকা রেঞ্জের ডিআইজি হাবিবুর রহমান বলেন গতকাল শনিবার দুপুরে বলেন, অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় রূপগঞ্জ থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করা হয়েছে। মামলা নং ১৯। মামলায় এই ৮ জনের নাম উল্লেখসহ অজ্ঞাতনামা লোকজনকে আসামি করা হয়েছে।
এদিকে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কামাল শনিবার ঘটনাস্থল পরিদশনে যান। এসময় তিনি উপস্থিত সাংবাদিকদের বলেন, তদন্ত করে দোষীদের বিচার হবে। ইতোমধ্যে ৮ জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে। গাফিলতি বিন্দুমাত্র থাকলে কারও ছাড় নেই। ঘটনাটি অত্যন্ত হƒদয় বিদারক ও মর্মান্তিক। যারা মারা গেছেন তাদের আত্মার মাগফিরাত কামনা করছি এবং আশা করছি যারা অসুস্থ তারা সুস্থ হয়ে ফিরে আসবেন।
স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আরো বলেন, তিনটি তদন্ত কমিটি হয়েছে। তদন্তের পরই বলা যাবে কার দোষ কতটুকু। কিন্তু তদন্তে কারো নির্মাণ ত্রুটি, শ্রমিক পরিচালনায় ত্রুটি বা কেউ যদি সামান্য ভুলও করে থাকেন তবে তাকে ছাড় দেয়া হবে না। এ সময় শিশুশ্রম নিয়ে প্রশ্ন করলে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, তদন্তে সেটি বেরিয়ে আসলে অবশ্যই বিচার হবে। শ্রমিকরা ছাদে তালাবদ্ধ ছিল এমন অভিযোগ সম্পর্কে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী তার বক্তব্যের পুনরাবৃত্তি করে বলেন, তদন্তে সামান্যতম ত্রুটি বা গাফিলতি যদি পাওয়া যায় তবে তার বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়া হবে।
অপরদিকে কারখানায় ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে অর্ধশতাধিক শ্রমিক নিহতের ঘটনার প্রতিবাদ ও কারখানা মালিকের শাস্তির দাবিতে বিক্ষোভ করেছে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘ। শনিবার জাতীয় প্রেস ক্লাবের সামনে বাংলাদেশ ট্রেড ইউনিয়ন সংঘের কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি খলিলুর রহমানের সভাপতিত্বে এ বিক্ষোভ অনুষ্ঠিত হয়। বিক্ষোভ সমাবেশে বক্তৃতা করেন সংগঠনের যুগ্ম-সম্পাদক প্রকাশ দত্ত। এছাড়াও সমাবেশে সংহতি জানিয়ে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট সুইটমিট শ্রমিক ফেডারেশননের সাধারণ সম্পাদক আনোয়ার হোসেন, বাংলাদেশ সিএনজি অটোরিকশা চালক সংগ্রাম পরিষদের আহ্বায়ক হানিফ শেখ, ঢাকা পোশাক প্রস্তুতকারক শ্রমিক সংঘের যুগ্ম-আহ্বায়ক মাহবুবুল আলম মানিক, বাংলাদেশ হোটেল রেস্টুরেন্ট মিষ্টি বেকারি শ্রমিক ইউনিয়নের সভাপতি আখতারুজ্জামান খান, জাতীয় গণতান্ত্রিক ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় সদস্য আতিকুল ইসলাম টিটো।

সজীব গ্রুপের চেয়ারম্যানসহ ৮ জন রিমান্ডে
সমাবেশে বক্তারা বলেন, কারখানায় অগ্নিকাণ্ডে এখন পর্যন্ত অগ্নিদগ্ধ ৫২ জনের মরদেহ উদ্ধার হয়েছে এবং এখনো অনেকে নিখোঁজ ও আহত হয়ে চিকিৎসাধীন অবস্থায় মৃত্যুর সঙ্গে পাঞ্জা লড়ছে। ঘটনার তিন দিন হতে চললেও এখনো উদ্ধার কাজ শেষ না হওয়ায় ক্ষোভ প্রকাশ করেন।
বক্তারা বলেন, উদ্ধার কাজের এ দীর্ঘসূত্রিতায় অনেকের লাশ গুম হওয়ার আশঙ্কা থেকেই যায়। অগ্নিকাণ্ডের সময় প্রায় ২০০ জন শ্রমিক কর্মরত ছিল। কিন্তু এখনো অনেকেরই খোঁজ পাওয়া যাচ্ছে না। সরকার কথায় কথায় উন্নয়নের সাফাই গাইলেও অগ্নিকাণ্ড নিয়ন্ত্রণে আধুনিক প্রযুক্তি, পর্যাপ্ত লোকবল ও যন্ত্রপাতির ব্যবস্থা না করায় প্রায় ২৪ ঘণ্টার মতো আগুন জ্বলছিল। একের পর এক অগ্নিকাণ্ড, ভবন ধসের ঘটনায় শ্রমিকের তাজা প্রাণ ঝরে গেলেও নিরাপদ কর্মপরিবেশ নিশ্চিত করা হয়নি। শ্রমিক নেতারা এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করে দায়ীদের দৃষ্ঠান্তমূলক শাস্তি দাবি করে বলেন, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, কারখানা থেকে বের হওয়ার গেটে তালা বন্ধ করে রাখায়, অগ্নিনির্বাপনের ব্যবস্থা না থাকা এবং শ্রমআইন লঙ্ঘন করে শোষণের মানসিকতার কারণে এত মৃত্যুর ঘটনা ঘটেছে। এছাড়াও এতবড় একটি কারখানায় বের হওয়ার জন্য মাত্র দু’টি সিঁড়ি ও ভবন নির্মাণের নানারকম ত্রুটির বিষয়ও সামনে আসছে। তারা বলেন, সবমিলিয়ে এ অগ্নিকাণ্ড কোনোভাবেই নিছক কোনো দুর্ঘটনা নয়, এটা হত্যাকাণ্ড। এমন হত্যাকাণ্ডের জন্য মালিকদের পাশাপাশি সরকার ও সংশি¬ষ্ট কর্তৃপক্ষ কোনভাবেই এর দায় এড়াতে পারে না।


প্রসঙ্গত, রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের সেজান জুস কারখানায় গত বৃহস্পতিবার বিকাল সাড়ে ৫টায় আগুনের সূত্রপাত হয়। কারখানার ছয় তলা ভবনটিতে তখন প্রায় চারশ’র বেশি কর্মী কাজ করছিলেন। কারখানায় প্লাজস্টিক, কাগজসহ মোড়কীকরণের প্রচুর সরঞ্জাম থাকায় আগুন মুহূর্তে ছড়িয়ে পড়ে সব ফ্লোরে। কারখানার সিঁড়ির দরজা তালাবদ্ধ থাকায় মৃতের সংখ্যা এত বেশি হয়েছে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। প্রচুর পরিমাণ দাহ্য পদার্থ থাকায় কয়েকটি ফ্লোরের আগুন নিয়ন্ত্রণে আনতে ফায়ার সার্ভিসের ১৮টি ইউনিটের ২০ ঘণ্টার বেশি সময় লাগে। গত শুক্রবার দুপুরে কারখানার ভেতর থেকে ৪৯ জনের লাশ উদ্ধার করা হয়েছে। এর আগে, আগুনে পুড়ে তিন জনের মৃত্যু হয়। সবমিলিয়ে এ পর্যন্ত ৫২ জনের লাশ উদ্ধার হয়েছে।

print

Leave a Reply