কাঁন্নায় ভারি হয়ে উঠেছে রূপগঞ্জ


টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: কাঁন্নায় ভারি হয়ে উঠেছে বাংলাদেশের রূপগঞ্জ এলাকা। ধোঁয়ায় আচ্ছন্ন আকাশ। চারদিকে আতঙ্ক। কেউ বিলাপ করছে স্ত্রী’র জন্য, কেউ মায়ের জন্য, কেউ সন্তানের আবার কেউ বাবার জন্য। এরা সবাই নিখোঁজ। প্রিয়জনের মুখটা একবার দেখার জন্য কাঁন্নারতদের ব্যাকুলতার শেষ নেই। কেউ আবার বলছে অন্তত লাশটা এনে দেন। শুক্রবার বাংলাদেশের নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জে সজীব গ্রুপের অঙ্গপ্রতিষ্ঠান হাসেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজের ফুডস ফ্যাক্টরির (সেজান জুসের কারখানা) আশেপাশের চিত্র ছিল এমন। বৃহস্পতিবার এই ফ্যাক্টরিতে লাগা আগুনে শুক্রবার বিকেল পর্যন্ত ৫২ জনের মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। লাশগুলো এতটাই পুড়েছে যে সনাক্ত করা যাচ্ছে না। এ অগ্নিকাণ্ডে অনেক মানুষ নিখোঁজ রেয়েছে এবং মৃত্যুর সংখ্যা আরো বাড়াতে পারে বলে জানিয়েছে ফায়ার সার্ভিস। বর্তমানে রূপগঞ্জের বাতাসে পোড়া লাশের গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে।


এদিকে সারি সারি লাশ সামনে তবে চেনার কোন উপায় নাই। আগুনে এতটাই পুড়েছে যে লাশ যেন লাশ না, কয়লা খন্ড। তাই নিহতদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহে সিআইডির ফরেনসিক টিম।
কারখানার শ্রমিকরা জানান, বৃহস্পতিবার বিকেল ৫টার দিকে ওই ভবনের বিভিন্ন তলায় কাজ করছিলেন তারা। হঠাৎ করে গ্যাসের গন্ধ পেয়ে শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে পড়ে চারদিকে ছুটতে থাকেন। এ সময় আগুন লাগার খবরে পঞ্চম তলার শ্রমিকরা আতঙ্কিত হয়ে ভবনের ছাদে চলে যায়। যারা দ্রুত সিড়ি দিয়ে নামতে পারেন তারই রক্ষা পান।
ফায়ার সার্ভিসের কর্মকর্তারা জানান, ভবনের চতুর্থ তলায় ললিপপ, তরল চকলেট, তৃতীয় তলায় অরগানিক পানীয় (জুস, লাচ্ছি), দোতলায় টোস্ট বিস্কুট, বিভিন্ন ধরনের পানীয় এবং নিচতলায় বাক্স ও পলিথিন তৈরির কারখানা ছিল। পঞ্চমতলার একপাশে সেমাই, সেমাই ভাজার তেল, পলিথিন; অপর পাশে কারখানার গুদাম ছিল। কারখানার ষষ্ঠতলায় ছিল কার্টনের গুদাম। টানা ১৯ ঘণ্টা ধরে আগুন জ্বলতে থাকায় ভবনটিতে ফাটলও দেখা দেয়। ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স নারায়ণগঞ্জ অফিসের উপ-সহকারী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল আরেফীন বলেন, পাঁচ অ্যাম্বুলেন্সে করে আমরা মরদেহ ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে পাঠিয়েছি, ময়নাতদন্তের জন্য।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, নিহতদের মধ্যে অনেক শিশু শ্রমিক আছে। পরিচয় শনাক্তের পর জানা যাবে সেখানে কত জন শিশু শ্রমিক ছিল। আগুনের ঘটনায় ৭ সদস্যের তদন্ত কমিটি গঠন করেছে নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসন।

তিন ফ্লোর থেকেই অধিকাংশ মরদেহ উদ্ধার
কাঞ্চন ফায়ার সার্ভিসের ইনচার্জ শাহ-আলম বলেন, গত বৃহস্পতিবার মধ্যরাতে আগুন কিছুটা নিয়ন্ত্রণে এলেও শুক্রবার ভোর ৬টার দিকে কারখানার চারতলায় আবারও আগুন বাড়তে থাকে। ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স অধিদপ্তরের কন্ট্রোল রুম জানিয়েছে, ১-৪ তলা থেকে ৪৯টি মরদেহ উদ্ধার করা হয়েছে। ৫ ও ৬ তলায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা এখনো প্রবেশ করতে পারেননি।


প্রত্যক্ষদর্শীরা জানায়, হাশেম ফুডস লিমিটেডের ৭ তলা ভবনের নিচ তলার একটি ফ্লোরে হঠাৎ করে আগুনের সূত্রপাত ঘটে। সময়ের সাথে সাথে আগুনের লেলিহান শিখা বাড়তে থাকে। একপর্যায়ে আগুন পুরো ভবনে ছড়িয়ে পড়ে। কালো ধোঁয়ায় গোটা কারখানাটি অন্ধকার হয়ে যায়। শ্রমিকরা ছোটাছুটি করতে শুরু করেন। কেউ কেউ ভবনের ছাদে অবস্থান নেন। এ সময় ঘটনাস্থলেই স্বপ্না রানী ও মিনা আক্তার নামে দুই নারী শ্রমিক নিহত হন। রাত ১১টার দিকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালে মোরসালিন (২৮) নামে আরও একজনের মৃত্যু হয়। প্রাণে বাঁচতে ভবন থেকে লাফিয়ে পড়েন অনেকে। লাফিয়ে পড়ে আহত হওয়া অন্তত ছয়জনকে ঢামেকে ভর্তি করা হয়। আগুন লাগার পর থেকেই শঙ্কা ছিল কারখানার ভেতর অনেক শ্রমিক হয়তো আটকা পড়েছেন। রাত ৯টার দিকে দেখা যায়, ভবনের সামনে ও পেছন দিক থেকে আগুন নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করে ফায়ার সার্ভিস। কিন্তু আগুনের তীব্রতা বেশি ও প্রচণ্ড কালো ধোঁয়া থাকায় ফায়ার সার্ভিসের কর্মীরা ভবনের ভেতরে প্রবেশ করতে পারেননি। কারখানাটির সপ্তম তলায় একটি কেমিক্যাল গোডাউন ছিল বলে খবর পাওয়া গেছে। এই গোডাউনের কারণে আগুনের ব্যাপকতা বেড়েছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
এদিকে অগ্নিকাণ্ডের ঘটনায় নিহতদের পরিবার ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ পাবেন। আর আহতরা পাবেন ১০ হাজার টাকা। নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে এ ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে বলে জানিয়েছেন অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক শামীম বেপারী। হাশেম ফুড অ্যান্ড বেভারেজ লিমিটেডের কারখানার ধ্বংসস্তূপ থেকে উদ্ধার করা মরদেহ ঢাকা মেডিকেলের মর্গে রাখার পর তিনি সাংবাদিকদের এ তথ্য জানান।
শামীম বেপারী বলেন, যেহেতু মরদেহগুলো পুড়ে গেছে, তাই ডিএনএ পরীক্ষার মাধ্যমে পরিচয় শনাক্ত করা হবে। পরিচয় শনাক্তের পর নারায়ণগঞ্জ জেলা প্রশাসকের পক্ষ থেকে নিহতের পরিবারকে ২৫ হাজার টাকা ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে। আর যারা আহত হয়েছেন তাদেরকে ১০ হাজার টাকা করে ক্ষতিপূরণ দেয়া হবে।

dhakapost
নিহতদের ডিএনএ স্যাম্পল সংগ্রহে সিআইডির ফরেনসিক টিম। গতকাল শুক্রবার বিকেলে তারা মরদেহ থেকে নমুনা সংগ্রহের কাজ শুরু করেন। আগুনে পুড়ে যাওয়ায় মরদেহ শনাক্ত করা যাচ্ছে না। তাই এখন ডিএনএ পরীক্ষা ছাড়া আর কোনো বিকল্প নেই। প্রথমে ঢামেক মর্গ থেকে মরদেহগুলোর নমুনা সংগ্রহ করা হবে। পরে স্বজনদের নমুনা সংগ্রহ করা হবে। যাদের সঙ্গে ডিএনএ মিলবে, তাদের পরিবারের কাছে মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। সিআইডির অতিরিক্ত বিশেষ পুলিশ সুপার মোস্তাফিজ মনিরের নেতৃত্বে এই নমুনা সংগ্রহের কাজ চলে।

print

Leave a Reply