সেন্টমার্টিনের মালিকানা দাবি মায়ানমারের

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট, ঢাকা: মায়ানমারের মানচিত্রে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনকে অন্তর্ভুক্ত করে নিজেদের বলে দাবি করার অপচেষ্টা করছে। এঘটনায় দেশটির রাষ্ট্রদূতকে তলব করে তীব্র প্রতিবাদ ও অবিলম্বে মায়ানমারের এ ধরনের ভুয়া দাবি উত্থাপনের দ্রুত ব্যাখ্যা দিতে বলা হয়েছে। জানা গেছে, মায়ানমার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (এমআইএমইউ) নামের দেশটির সরকারি একটি ওয়েব সাইটের মানচিত্রে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনকেও মায়ানমারের মধ্যে চিহ্নিত করা হয়েছে। পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, কঙ্বাজারের সর্বদক্ষিণে নাফ নদীর মোহনায় বঙ্গোপসাগরের দ্বীপ ইউনিয়ন সেন্টমার্টিন মায়ানমারের বলে তাদের সরকারের কয়েকটি ওয়েবসাইটে দাবি করা হয়েছে। এমনকি দ্বীপের মানুষজনকেও দাবি করা হয়েছে মায়ানমারের নাগরিক।
এ প্রসঙ্গে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের একজন কর্মকর্তা বলেন, মায়ানমারের ভূখন্ডের অংশ হিসেবে সেন্টমার্টিনকে দেখানোর পেছনে তাদের ‘অস্পষ্ট মনোভাব’-এর বিষয়ে ঢাকা চিন্তিত। কারণ, দ্বীপটি ব্রিটিশ আমল থেকে কখনোই তাদের ভূখ-ের অংশ ছিল না এবং ‘এখন পর্যন্ত ভূখ- গত মালিকানা নিয়ে তাদের সঙ্গে কোনও ধরনের বিবাদও হয়নি।’

বিষয়টি জানতে পেরে ঢাকায় নিযুক্ত দেশটির রাষ্ট্রদূত উ লুইনকে তলব করে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়। এরপর তার হাতে কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র ধরিয়ে দেন পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মেরিটাইম অ্যাফেয়ার্স ইউনিটের প্রধান অ্যাডমিরাল (অব.) মো. খুরশেদ। একইসাথে বাংলাদেশের পক্ষ থেকে এই ঘটনার তীব্র প্রতিবাদও জানানো হয়।

গতকাল শনিবার দুপুরে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব (সমুদ্র বিষয়ক) অবসরপ্রাপ্ত নৌ কর্মকর্তা মো. খুরশেদ আলমের দফতরে মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও’কে তলব করা হয়। রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও প্রায় ১ ঘণ্টা পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ে ছিলেন। কূটনৈতিক সূত্রে জানা গেছে, মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও’কে ডেকে এনে বলা হয়, মায়ানমার সরকার গায়ে পড়ে ঝগড়া করতে চাচ্ছে। মায়ানমার ইচ্ছাকৃতভাবে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনকে বৈশ্বিক অঙ্গনে নিজেদের বলে প্রচার করছে, যা খুবই আপত্তিজনক। মায়ানমার যদি এমন আপত্তিজনক কাজ চালিয়ে যেতে থাকে তবে বাংলাদেশ উপযুক্ত ব্যবস্থা নেবে।

এ সময় রাষ্ট্রদূত উ লুইন ও’র হাতে একটি কূটনৈতিক প্রতিবাদপত্র ধরিয়ে দেয়া হয়। যাতে সেন্টমার্টিন যে বাংলাদেশের অংশ তার পূঙ্খানুপুঙ্খ প্রমাণ রয়েছে। পাশাপাশি ঐ চিঠিতে মায়ানমারের এমন আপত্তিকর কাজের জবাবও চাওয়া হয়।

বাংলাদেশের পক্ষ থেকে বলা হয়েছে, সেন্টমার্টিন কখনোই মায়ানমারের অংশ ছিল না। এমনকি ব্রিটিশ আমলেও এটা মায়ানমারের অংশে পড়েনি। ১৯৩৭ সালে মায়ানমার যখন ব্রিটিশ-ভারত থেকে ভাগ হয়ে যায়, তখনো এই দ্বীপ মায়ানমারের মধ্যে ছিল না। মায়ানমার কিসের ভিত্তিতে এই দ্বীপের অংশ তাদের বলে দাবি করছে তা রাষ্ট্রদূতের কাছে জানতে চাওয়া হয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তরফ থেকে।

মায়ানমার ইনফরমেশন ম্যানেজমেন্ট ইউনিট (এমআইএমইউ) নামের দেশটির সরকারি একটি ওয়েব সাইট রয়েছে। ঐ সাইটে গিয়ে দেখা গেছে, দেশটির জাতীয় খানা জরিপ শেষে যে পরিসংখ্যান উপস্থাপন করা হয় তাতে বাংলাদেশের সেন্টমার্টিনকে মায়ানমারের মধ্যে অর্ন্তভুক্ত করা হয়েছে। শুধু তাই নয়, খানা জরিপে সেন্টমার্টিনের অধিবাসীদের মায়ানমারের নাগরিক বলে দেখানো হয়। মায়ানমারের মানচিত্রের রঙের সাথে সেন্টমার্টিনের রঙ মিশিয়ে দেয়া হয়েছে, এক্ষেত্রে আন্তর্জাতিক সীমানা মানেনি দেশটি।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় থেকে জানা গেছে, ১৯৩৭ সালে মানচিত্রে সেন্টমার্টিন ভারত উপমহাদেশের অংশ ছিল। ১৯৪৭ সালে ভারত-পাকিস্তান ভাগের পর সেন্টমার্টিন ঐ সময়ের পাকিস্তান অংশে ছিল। ১৯৭১ সালে বাংলাদেশ স্বাধীন হওয়ার সময়েও সেন্টমার্টিন বাংলাদেশের অংশে ছিল। সর্বশেষ ২০১৩ সালের ১৪ মার্চ সমুদ্রসীমা বিষয়ক জাতিসংঘের আন্তর্জাতিক ট্রাইব্যুনাল (আইটিএলওএস) বাংলাদেশ ও মায়ানমারের সমুদ্রসীমা বিষয়ক বিরোধ নিষ্পত্তির রায় দেন। ঐ রায়েও সেন্টমার্টিনকে বাংলাদেশের অংশ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। এই বিষয়ে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের সচিব পর্যায়ের একজন কর্মকর্তার সাথে আলাপে মায়ানমারের এই কাজকে ‘দূরভিসন্ধিমূলক’ বলে উল্লেখ করেন। তবে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অপর একটি সূত্র জানায়, তলবের প্রেক্ষিতে মায়ানমারের রাষ্ট্রদূত বলেছেন, এটা ভুলবশত হয়েছে।

print

Leave a Reply