লকডাউনে রবীন্দ্রজয়ন্তী: ১৬০তম জন্মবার্ষিকী অন্য রকম ২৫ বৈশাখ

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট : ২৫ বৈশাখ কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন। শনিবার ভোর হতেই শঙ্খ বেজে ওঠবে জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে। বিশ্বভারতীর উপাসনা প্রাঙ্গণে তখন ধ্বনিল রে-এর সুর। সেজে ওঠে কবিগুরু বাড়ি, দিনভর অনুষ্ঠানসূচী ফেরে মানুষের হাতে হাতে। রবীন্দ্র সদন থেকে শুরু করে পাড়ার ওলি-গলি, মহাসমারহে পালিত হয় রবীন্দ্র জয়ন্তী। রবীন্দ্র সঙ্গীত থেকে শুরু কওে কবিগুরু কবিতা, নৃত্যনাট্যে ভওে ওঠে বাংলার আকাশ-বাতাস। তবে ২০২০ ও ২০২১ সাল সেই চেনা ছবি আর ধরা দিল না। দীর্ঘ ১৬০ বছরে এ এক অন্য রকম সকাল। নেই কোনও আড়ম্বর, নেই শয়ে শয়ে ভক্তের ভিড়। রবীন্দ্রজয়ন্তী পালন এ বছর লকডাউনে। যে রবীন্দ্রজয়ন্তী ভক্তদেও দূর দূরান্ত থেকে এক ছাদেও তলায় নিয়ে আসত, যে ২৫ বৈশাখ জোড়াসাঁকো ঠাকুর বাড়িতে উপচে পড়া ভিড়ের সাক্ষী থাকত আজ তা অন্মান।
জানা গেছে, ২৫ শে বৈশাখ ১৪২৮ সাল কবিগুরু রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ১৬০ তম জন্মবার্ষিকী। ১২৬৮ সালের ২৫ শে বৈশাখের শুভ লগ্নে কোলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারে পিতা মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ও মা সারদাদেবীর কোল আলো করে যে শিশু জন্ম নিয়েছেন তিনি বিশ্বের কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। শৈশবে বিভিন্ন স্কুলে তাঁকে ভর্তি করা হয় বিদ্যার্জন করার জন্য কিন্তু শিশু রবীন্দ্রনাথের কাছে চার দেওয়ালে আবদ্ধ বিদ্যালয় বা প্রথাগত শিক্ষা কোনোটাই গ্রহণ যোগ্য হয়নি। বাড়ির অনুক‚ল পরিবেশে এবং পিতার সান্নিধ্যে থেকেই তিনি প্রকৃত শিক্ষা লাভ করেন। তিনি প্রাচীন ভারতবর্ষের তপোবনে যে ভাবে শিক্ষাদান কার্য সম্পাদিত হত সেই আদর্শকেই জীবনে গ্রহণ করেছিলেন। পরিণত বয়সে শান্তিনিকেতনে তিনি আশ্রমিক বিদ্যালয় গড়ে তোলেন। প্রকৃতির মুক্তাঙ্গনে বসে তিনি ছাত্র-ছাত্রীদের শিক্ষা দিতেন। তিনি এখানে শিক্ষক নন, তিনি হলেন গুরুদেব।
রবীন্দ্রনাথ বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী ছিলেন। তবে তাঁর সব থেকে বড় পরিচয় তিনি কবি । বাংলা সাহিত্যের প্রতিটি শাখায় রয়েছে তাঁর উজ্জ্বল উপস্থিতি। সোনারতরী, ক্ষণিকা, মানসী, পূরবী, চিত্রা, গীতালী, গীতাঞ্জলির মতো অজস্র কাব্য-কবিতা, ডাকঘর, রাজা, রক্তকরবী, বিসর্জন, মুক্তধারা প্রভৃতি অসামান্য নাট্যসম্ভার, বৌঠাকুরানীর হাট, গোরা, চতুরঙ্গ, ঘরে বাইরে প্রভৃতির মত উপন্যাস, ছুটি, সুভা, দানপ্রতিদান, পোস্টমাস্টার, দেনাপাওনা অতিথির মতো অসংখ্য ছোট গল্প যা বাংলা সাহিত্যকে সমৃদ্ধ করেছে। শিক্ষা, দর্শন, রাজনীতি, সমাজনীতি, বিজ্ঞান প্রভৃতি বিষয় নিয়ে লিখেছেন একাধিক প্রবন্ধ। আর সঙ্গীত— এখানে এর কোনো তুলনা করা যাবে না। রবীন্দ্রসংগীত বিশাল সমুদ্রের মতো। সংগীত রচয়িতা হিসাবে তিনি রাজাধিরাজ। প্রেম, প্রকৃতি, পূজা ঈশ্বরভাবনা সবকটি দিকেই রয়েছে অজস্র গানের ডালি ।
দেশে বিদেশে বহু জায়গায় তিনি আমন্ত্রিত হয়ে গিয়েছেন বা ভ্রমণ করেছেন। বাইরের জগৎ থেকে কিছু বিষয় তিনি নিজের মনের মাধুরী মিশিয়ে রচনা করেছেন অসামান্য সব গীতিনাট্য, নাট্যকাব্য যেমন— বাল্মীকির প্রতিভা, চিত্রাঙ্গদা, শ্যামা, চন্ডালিকা, প্রভৃতি, যেগুলি একেবারে নতুন আঙ্গিকে তিনি নিজে অভিনয় করে দেখিয়েছেন। প্রতিটি নাটক, নৃত্যনাট্যয় তিনি মানবতার চরম সত্যকে প্রকাশ করেছেন ।
রবীন্দ্রনাথ সামান্য একজন মানুষ নন তিনি মহামানব। তাঁর মধ্যে মানবপ্রেম, প্রকৃতিপ্রেম, ভগবৎপ্রেম সব কিছুই এত সুন্দর ভাবে ও এমন পরিপূর্ণভাবে প্রকাশ পেয়েছে যা সত্যি অতি বিস্ময়কর। মানবপ্রেমিক কবি শিখিয়েছেন মানুষকে ভালোবাসতে, ক্ষমাসুন্দর চোখে দেখতে। মানুষেরে ভালোবাসলে ভাগবানকে ভালবাসা হয়।
তিনি নারীকে সম্মান করেছেন। নারী শুধু ভোগ্যপণ্য নয় তার আপন সত্তায় সে মহীয়ান হতে পারে সে কথা তিনি বহু কবিতায় গানে বলেছেন। প্রকৃতি প্রেম তাঁর কাব্য কবিতায় এমন সুন্দরভাবে সন্নিবেশিত হয়েছে যার কোনো তুলনা নেই। প্রতিটি ঋতু গ্রীষ্ম, বর্ষা, শরৎ, হেমন্ত, শীত, বসন্ত যেন এক একটি জীবন্ত চরিত্র। ‘এসো হে বৈশাখ’, ‘শরৎ তোমার অরুণ আলোর অঞ্জলি’ প্রভৃতি গানের মধ্যে দিয়ে প্রতিটি ঋতুর সুন্দর বৈশিষ্ট্য যেভাবে পাই আর কোথাও সেভাবে পাওয়া যায় না।
এত বছর পরেও রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও সৃষ্টি দারুন ভাবে আজকের সমাজে প্রাসঙ্গিক । কারণ রবীন্দ্রনাথের জীবনদর্শন ও সৃষ্টি আমাদের এই অস্থিরময় জীবনে সঠিক পথের দিশা দেখাতে পারে, পারে আত্মগ্লানির হাত থেকে মুক্তি দিতে। দমবন্ধকর আবহাওয়া থেকে একটু খোলা হাওয়া এনে দিতে পারে রবীন্দ্রসংগীত। আলোকের এই ঝর্ণা ধারায়, কিছুক্ষণের জন্যে হলেও মানুষ একটু স্বস্তির নিশ্বাস ফেলতে পারে।
তবে করোনা প্রকোপের কারণে আজ ২৫ বৈশাখ রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মদিন ঘরে বসেই পালিত হবে কবি প্রণাম। কলকাতায় রাজ্য সরকার অনলাইনে কবি প্রণামের আয়োজন করেছে। করোনার ধাক্কায় এবার রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের জন্মজয়ন্তী অনুষ্ঠান বাতিল করা হয়েছে। তাই এবার সবাই ঘরে বসেই সারবেন কবি প্রণাম।
রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য সব্যসাচী বসু রায় চৌধুরী জানিয়েছেন, বিগত বছরগুলো যেভাবে ২৫ শে বৈশাখের অনুষ্ঠান হয়ে এসেছে এবছর সেভাবে অনুষ্ঠানের কোনো অবকাশ নেই। করোনা পরিস্থিতিতে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের যে নির্দেশিকা রয়েছে তাকে মান্যতা দিয়েই এই সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়েছে। তাই ঠিক হয়েছে কবিগুরুকে শুধুমাত্র মাল্যদান এর মধ্যে দিয়ে শ্রদ্ধা জানানো হবে। বিশ্ববিদ্যালয়ের হাতেগোনা কয়েকজন আলাদা আলাদা ভাবে এসে শ্রদ্ধা জানিয়ে যাবেন।

print

Leave a Reply

সর্বশেষ