অস্ত্র লুট, পুলিশ হত্যার পর ছদ্মবেশে ৩০ বছর

টাইমস আই বেঙ্গলী ডটনেট: প্রায় ৩০ বছর আগে এক চরমপন্থিকে ছিনিয়ে নিতে নাটোরের গুরুদাসপুর থানায় হামলা চালিয়ে অস্ত্র লুট ও এক কনস্টেবলকে হত্যা মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এক আসামিকে গ্রেফতার করেছে র‌্যাব। ছদ্মবেশ নিয়ে গত ৩০ বছর ধরে পলাতক ছিলেন সাইফুল ইসলাম নামের এই ব্যক্তি। তথ্যপ্রযুক্তির সহায়তায় ও গোয়েন্দা নজরদারির মাধ্যমে শুক্রবার রাতে অভিযান চালিয়ে নারায়ণগঞ্জ জেলার রূপগঞ্জ এলাকা থেকে ছাত্তার নামে ছদ্মবেশ নিয়ে আত্মগোপন করে থাকা সাইফুল ইসলামকে (৫৬) গ্রেফতার করা হয়।
শনিবার (১০ সেপ্টেম্বর) দুপুরে রাজধানীর কারওয়ান বাজারে র‌্যাব মিডিয়া সেন্টারে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে এসব তথ্য জানান র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক (সিও) লেফট্যানেন্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ। ১৯৮৭ সালে ২৪ ফেব্রুয়ারি হাটের দিন সকাল ১১টার দিকে একদল চরমপন্থি লুঙ্গি, গামছা পরে ছদ্মবেশ ধারণ করে পোটলায় অত্যাধুনিক অস্ত্র লুকিয়ে নিয়ে হাটের মধ্যে ঘোরাফেরা করতে থাকেন। তাদের মধ্যে কিছু সদস্য অস্ত্র প্রদর্শন করে টেলিফোন অফিস নিয়ন্ত্রণে নিয়ে সেন্ট্রাল কমান্ড বিকল করে দেন। অন্যদিকে কয়েকজন জিডি করার নাম করে থানায় ঢুকে অস্ত্রের মুখে থানার নিয়ন্ত্রণ নেন। থানায় প্রহরারত কনস্টেবল হাবিবুর রহমান বাধা দিলে চরমপন্থিরা তাকে গুলি করে হত্যা করেন। ভীতিকর পরিবেশ সৃষ্টি করে থানার অস্ত্রাগার লুট করে ২টি এসএমজি, ৪টি এসএলআর, ১৮টি ৩.৩ রাইফেল ও গোলাবারুদ লুট করে থানার হাজতখানায় বন্দি এক চরমপন্থিকে ছিনিয়ে নিয়ে যান।
আতঙ্ক সৃষ্টির জন্য তারা একযোগে টেলিফোন অফিস ও থানা কম্পাউন্ডে বোমা বিস্ফোরণ ঘটান। এরপর লুট করা মালামাল নিয়ে তাঁচকৈর হয়ে পূর্বদিকে গারিসাপাড়া হয়ে ধামাইর মাঠের দিকে চলে যান তারা। এরপর আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হলেও জামিনে বের হয়ে আত্মগোপনে চলে যায় চরমপন্থি সাইফুল ইসলাম। খুনসহ ডাকাতি মামলায় যাবজ্জীবন দণ্ডপ্রাপ্ত এই আসামি ৩০ বছর আত্মগোপনে ছিলেন।
র‌্যাব-৩ এর অধিনায়ক বলেন, ওই ঘটনায় অজ্ঞাতনামা আসামিদের বিরুদ্ধে নাটোর জেলার গুরুদাসপুর থানায় দুটি মামলা দায়ের করা হয়। মামলার তদন্ত শেষে সিআইডির তদন্তকারী কর্মকর্তা ২০ জন আসামি গ্রেফতার করেন। গ্রেফতার আসামিদের জবানবন্দি, সাক্ষীদের সাক্ষ্য ও পারিপার্শ্বিক সাক্ষ্যের ভিত্তিতে ৪৯ জনকে আসামি করে গুরুদাসপুর থানার দুটি মামলার চার্জশিট আদালতে দাখিল করা হয়। বিচার প্রক্রিয়া শেষে ২০০৭ সালে সেই মামলার রায় ঘোষণা করেন আদালত।
লেফট্যানেন্ট কর্নেল আরিফ মহিউদ্দিন আহমেদ আরও বলেন, আসামিকে জিজ্ঞাসাবাদে জানা যায়, তিনি ১৯৮৪ সালে চরমপন্থি নেতা তারেকের মাধ্যমে পূর্ব বাংলা কমিউনিস্ট পার্টি (লাল পতাকা) ওরফে সর্বহারা দলে যোগ দেন। চরমপন্থি নেতা তারেক প্রতি সপ্তাহে চাটমোহর এলাকায় উঠতি বয়সের যুবকদের বাড়ি থেকে ডেকে নিয়ে গিয়ে উঠান বৈঠক করতেন। তিনি বলতেন, তার দলে যোগ দিলে কোনো অভাব-অনটন থাকবে না। তারা সকলের সমান অধিকার নিশ্চিত করবেন। কেউ তাদের কাজে বাধা দিলে তাদের পৃথিবী থেকে সরিয়ে দেওয়া হবে। যদি সরকার বা সরকারের আইন-শৃঙ্খলা বাহিনী তাদের পথে বাধা হয়ে দাঁড়ায় তবে তারা পুলিশ হত্যা করে থানা-ফাঁড়ি লুট করবেন। তাদের এমন কথায় মুগ্ধ হয়ে সাইফুল হত্যা, লুটপাট, ত্রাস সৃষ্টি, অরাজক পরিস্থিতি সৃষ্টির কাজে অংশগ্রহণ করতে থাকেন।
র‌্যাব কর্মকর্তা জানান, ১৯৮৮ সালে তারেকের নেতৃত্বে চাটমোহর থানার খোতবাড়ি এলাকায় মাঠের মধ্যে রাতে নকশালপন্থি ও সর্বহারাদের মধ্যে সম্মুখযুদ্ধ হয়। এ ঘটনায় নকশালপন্থি ১২ জন নিহত হন। ঘটনার পর সাইফুলসহ সর্বহারা দলের সদস্যরা চলনবিলে গোসল করে যার যার বাড়িতে চলে যান। ভোর হলে পুলিশ ১২টি লাশ উদ্ধার করে থানায় মামলা রুজু করে। ওই মামলায় আসামি সাইফুল গ্রেফতার হন। গ্রেফতার আসামিদের জিজ্ঞাসাবাদে গুরুদাসপুর থানার অস্ত্র লুটের সত্যতা বেরিয়ে আসে। ওই মামলাগুলোতে জামিনে মুক্ত হয়ে সাইফুলের পলাতক জীবন শুরু হয়। জামিনে মুক্ত হওয়ার পর তিনি আদালতে কোনো হাজিরা দেননি। থানা লুট ও ১২ জনকে হত্যা মামলাসহ তার নামে ৫টি মামলা রয়েছে।

সাইফুলের জীবন বৃত্তান্ত
গ্রেফতার সাইফুল ইসলাম সর্বহারা দলের সক্রিয় সদস্য। সর্বহারাদের নেতৃত্বে পরিচালিত সব কার্যক্রমে তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করতেন। তার নির্দিষ্ট কোনো পেশা নেই। ত্রাস সৃষ্টি, লুটপাট ও চাঁদাবাজির মাধ্যমে প্রাপ্ত অর্থ দিয়েই তিনি জীবিকা নির্বাহ করতেন। তিনি ৫ম শ্রেণি পর্যন্ত লেখাপড়া করেছেন। তারা ৮ ভাই বোন। ধৃত আসামি ভাইবোনদের মধ্যে বড়। তার ১ ছেলে ও ১ মেয়ে রয়েছে। বর্তমানে তিনি নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় ছাত্তার নামে শ্রমিক সরদার হিসেবে কাজ করতেন। ২০১৮ সালে তিনি তার নাম পরিবর্তন করে সাইফুল প্রধান নামে নারায়ণগঞ্জের রূপগঞ্জ এলাকায় ভোটার হিসেবে এনআইডি তৈরি করেন। রূপগঞ্জ এলাকায় তিনি ছাত্তার নামে পরিচিত। ওই এলাকার মানুষ তার অপরাধ কার্যক্রম সম্পর্কে অবহিত নয়।

সাইফুলের পলাতক জীবন
১২ জনকে হত্যা মামলার পর তারেকসহ চরমপন্থি দলের সদস্যরা চাটমোহর থেকে আত্মগোপন করে সিরাজগঞ্জে আশ্রয় নেন। সেখান থেকে তারা তাদের দলীয় কার্যক্রম পরিচালনা করতেন। ১৯৮৯ সালের নভেম্বর মাসে তার স্ত্রীর সঙ্গে দেখা করতে গেলে তিনি আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর হাতে গ্রেফতার হন। জামিনে মুক্ত হয়ে তিনি তারেকের সঙ্গে যোগাযোগ করে চরমপন্থি দলের সঙ্গে পুনরায় হত্যা, লুটপাট, ডাকাতি, চাঁদাবাজি, অস্ত্র প্রদর্শন করে ত্রাস সৃষ্টি, অস্ত্র নিয়ে এলাকায় মহড়া দেওয়া, অর্থের বিনিময়ে জমি দখল, পারিবারিক বিরোধ মীমাংসা ইত্যাদি কাজে লিপ্ত ছিলেন।

এ সময় তিনি তারেকের সঙ্গ নৌকায় বিলের মধ্যে অবস্থান করতেন। দলের কার্যক্রম শেষে তারা পুনরায় সশস্ত্র অবস্থায় বিভিন্ন এলাকায় নৌকার মধ্যেই জীবন যাপন করতেন। ২০০৪ সালে চরমপন্থিদের বিরুদ্ধে র‌্যাবের সাঁড়াশি অভিযান শুরু হলে তারেকের নির্দেশে চরমপন্থিরা দেশের বিভিন্ন এলাকায় ছড়িয়ে পড়েন। তখন সাইফুল রাজধানীতে চলে আসেন। রাজধানীতে তিনি কিছুদিন বাসের হেলপারি করেন। ট্রাকে মালামাল লোড-আনলোডের শ্রমিক হিসেবে কাজ করে। এরপর নারায়ণগঞ্জে এক আত্মীয়ের বাসায় তিনি আশ্রয় নেন। ওই আত্মীয় তাকে একটি গার্মেন্টস কারখানায় চাকরি দেন এবং সকলের কাছে তাকে ছাত্তার নামে পরিচয় করিয়ে দেন। আস্তে আস্তে আইনশৃঙ্খলা বাহিনীর অভিযান স্তিমিত হয়ে এলে তিনি আবার মাঝে মাঝে এলাকায় গিয়ে সর্বহারা দলের কার্যক্রম চালিয়ে যেতে থাকেন।

৭-৮ বছর আগে চরমপন্থি দলের অভ্যন্তরীণ কোন্দলে তারেক নিহত হলে সাইফুল সর্বহারা দলের সঙ্গে যোগাযোগ কমিয়ে দেন। ইতোমধ্যে তিনি এনআইডি পরিবর্তন করে রূপগঞ্জ এলাকার ভোটার হিসেবে নিজেকে ছাত্তার নামে প্রতিষ্ঠিত করে স্ত্রী-সন্তান নিয়ে বসবাস করতে শুরু করেন। বর্তমানে ওই ঘটনায় জড়িত চরমপন্থি দলের সদস্যদের সাথে তার কোনো যোগাযোগ ছিল না। তারেকের মৃত্যুর পর ওই গ্রুপের সদস্যরা বিছিন্নভাবে তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছেন। ওই ঘটনার সঙ্গে জড়িত অপরাপর সদস্যদের শনাক্ত করে গ্রেফতারের চেষ্টা অব্যাহত আছে। গ্রেফতার সাইফুল ইসলামকে পাবনার চাটমোহর থানায় হস্তান্তর কার্যক্রম প্রক্রিয়াধীন রয়েছে বলে জানান র‌্যাব কর্মকর্তা।

সূত্র: বাংলানিউজ।

Related Articles

Back to top button